স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
পলিথিনের ভয়াবহ দূষণ থেকে পরিবেশ রক্ষায় এক দশক আগে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান পাট থেকে তৈরি করেছিলেন পলিথিনের বিকল্প ‘সোনালী ব্যাগ’।
পরিবেশবান্ধব এই উদ্ভাবনকে ঘিরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এটি এখনো সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছায়নি।
ফলে পলিথিনের ব্যবহার দিন দিন বাড়তে থাকলেও ঘরের মাটিতে জন্ম নেওয়া সম্ভাবনাময় এই বিকল্পটি পড়ে আছে অনেকটাই আড়ালে।
দীর্ঘ গবেষণার পর ২০১৬ সালে পাটের আঁশ থেকে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ‘সোনালী ব্যাগ’ তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোবারক আহমদ খান।
পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি এই ব্যাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রচলিত পলিথিনের মতো দীর্ঘদিন মাটিতে পড়ে থাকে না।
উদ্ভাবনের সময় থেকেই ‘সোনালী ব্যাগ’ নিয়ে পরিবেশবিদ, গবেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
কারণ পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে দেশে সহজলভ্য পাটকে ব্যবহার করে একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা সম্ভব হলে তা একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে পাটের বহুমুখী ব্যবহার ও বাজারও বাড়াতে পারে।
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পাটের সেলুলোজ দিয়ে তৈরি এই ব্যাগ নির্দিষ্ট পরিবেশে তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যে জৈবভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। মাটিতে ফেলে রাখলে কয়েক মাসের মধ্যে এটি পচে যাওয়ার কথা বলা হয়।
ফলে প্রচলিত পলিথিনের মতো বছরের পর বছর মাটি, নালা-নর্দমা, নদী-খাল কিংবা জলাশয়ে পড়ে থেকে পরিবেশের ক্ষতি করার ঝুঁকি থাকে না।
পলিথিনের কারণে দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। ড্রেন, খাল ও নদীতে জমে থাকা পলিথিন জলাবদ্ধতা বাড়ায়। কৃষিজমিতে পলিথিন জমে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে।
আবার নদী-খাল ও জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে জলজ পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যাগের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
‘সোনালী ব্যাগ’ সেই বিকল্পের একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ হতে পারত। বিশেষ করে বাংলাদেশ পাট উৎপাদনকারী দেশ হওয়ায় এর কাঁচামালের জোগানও দেশেই রয়েছে।
পাটের সেলুলোজ ব্যবহার করে ব্যাপক পরিসরে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ উৎপাদন করা গেলে পাটচাষিরাও এর মাধ্যমে নতুন বাজার পেতে পারেন। একই সঙ্গে পাটভিত্তিক শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
কিন্তু উদ্ভাবনের প্রায় এক দশক পরও কেন এই ব্যাগ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি, এ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
উদ্যোক্তা, গবেষক ও পরিবেশসচেতন মানুষের অনেকের অভিযোগ, গবেষণাগার থেকে কোনো উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে যেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। এসব ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনও বাস্তব জীবনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।
একটি উদ্ভাবন আবিষ্কার করাই শেষ কথা নয়। সেটিকে সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন, মান নিশ্চিত করা, বাজার তৈরি, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। ‘সোনালী ব্যাগ’-এর ক্ষেত্রেও সেই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি এই উদ্ভাবন দেশের অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই পাট ও পাটজাত পণ্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে দেশীয় পাট থেকে তৈরি জৈব-বিয়োজ্য ব্যাগ শুধু দেশের পলিথিনের বিকল্প নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনাময় পণ্য হয়ে উঠতে পারে।
তবে এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ। বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন যেন গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য সরকারি সংস্থা, বেসরকারি উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। উৎপাদন খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা গেলে এই ব্যাগের ব্যবহারও দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় শুধু পলিথিন নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প পণ্য তৈরি এবং বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ‘সোনালী ব্যাগ’ সেই বিকল্প তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতার একটি উদাহরণ।
এক দশক আগে একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে যে সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল, সেটি যেন আর সময়ের ভারে হারিয়ে না যায়, এটাই এখন প্রত্যাশা।
পলিথিনের কারণে যখন দেশের নদী-খাল, কৃষিজমি ও নগর পরিবেশ ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন পরিবেশবান্ধব দেশীয় প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান সরকারের কাছে তাই পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, ‘সোনালী ব্যাগ’সহ পরিবেশবান্ধব দেশীয় উদ্ভাবনগুলোকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে পাটের ‘সোনালী ব্যাগ’ একদিন সত্যিই পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘরের মাটিতে তৈরি এমন একটি সম্ভাবনাময় সমাধান যদি শুধু জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
এখন প্রয়োজন নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া, যাতে বিজ্ঞানীর গবেষণাগারের সাফল্য বাস্তব জীবনের সাফল্যে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশের পাট আবারও পরিবেশ রক্ষার বৈশ্বিক লড়াইয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে।