স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৬ পি এম

প্রয়োজন দেড় লাখ, কর্মরত মাত্র ৬ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট!

ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত, প্রস্রাব, টিস্যু, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং পরীক্ষার নির্ভুলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ওপর। অথচ দেশে এই গুরুত্বপূর্ণ পেশায় জনবল সংকট দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং টেকনোলজিস্টসের এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেক্রেটারি মো. সালেহীন আবেদীন তানিম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) জনবল পরিকল্পনার আলোকে দেশে প্রায় দেড় লাখ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র প্রায় ৬ হাজার। ফলে দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ নির্ণয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ সিদ্ধান্তই বিভিন্ন ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দক্ষ টেকনোলজিস্টের অভাব শুধু রোগ নির্ণয়কে বিলম্বিত করে না, ভুল রিপোর্টের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বাড়েনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন জনবল সংক্রান্ত তথ্যেও বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে হাজার হাজার বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ টেকনোলজিস্টের চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের পরিবর্তে অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এতে রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মান প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

রেডিওলজি ও ইমেজিং বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ডিজিটাল এক্স-রে কিংবা ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষার মান অনেকাংশে নির্ভর করে যন্ত্র পরিচালনাকারী টেকনোলজিস্টের দক্ষতার ওপর। একইভাবে প্যাথলজি পরীক্ষার ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে সামান্য ত্রুটিও ভুল রিপোর্টের কারণ হতে পারে।

মো. সালেহীন আবেদীন তানিম বলেন, দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল টেকনোলজি বিষয়ে শিক্ষার্থী পাস করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি নিয়োগ নেই। ফলে অনেক দক্ষ টেকনোলজিস্ট বেকার থাকছেন, আবার অনেকে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশের হাসপাতালগুলো জনবল সংকটে ভুগছে।

তিনি আরও বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও অন্যান্য সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্যখাতে জনবল পরিকল্পনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য অ্যালাইড হেলথ প্রফেশনাল-এর সমন্বিত জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সংস্থাটি বলছে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করতে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সংকট দূর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, নতুন পদ সৃষ্টি, নিয়মিত নিয়োগ পরীক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পেশাগত মানোন্নয়ন এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা।

তাদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও রোগীবান্ধব করতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের যথাযথ মূল্যায়ন ও জনবল বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবলের অভাবে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, 

“সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের কিছু পদ শূন্য রয়েছে, তবে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত জনবল পর্যালোচনা করছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শূন্য পদ পূরণ, নতুন পদ সৃষ্টি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি, রেডিওলজি ও ইমেজিংসহ বিভিন্ন বিভাগের সেবা সম্প্রসারণ হচ্ছে। এসব সেবা কার্যকর রাখতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আমরা স্বীকার করি। জনবল সংকট নিরসনে পর্যায়ক্রমে নিয়োগ ও পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।”