স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলেই অনেক দম্পতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন বা মাসের পর মাস লেট্রোজোল ও ক্লোমিফিনের মতো ওষুধ সেবন করছেন। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব পরীক্ষা বা ওষুধের প্রয়োজন হয় না। এতে অযথা উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এমনকি আইইউআই বা আইভিএফের মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতির দিকেও ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী এক বছর নিয়মিত অরক্ষিত দাম্পত্য জীবনযাপনের পরও গর্ভধারণ না হলে তবেই বন্ধ্যাত্বের মূল্যায়ন করা উচিত। তবে যেসব নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি, অনিয়মিত মাসিক, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), এন্ডোমেট্রিওসিসসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণ রয়েছে অথবা পুরুষের বীর্যের সমস্যা, ভ্যারিকোসিল, পূর্ববর্তী কেমোথেরাপি বা অস্ত্রোপচারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ছয় মাস চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করা উচিত। আর নারীর বয়স ৪০ বছরের বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করা উচিত নয়।
বন্ধ্যাত্ব মূল্যায়নের জন্য সাধারণত ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা নির্ণয়ে এএমএইচ (AMH) ও ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাফি (TVS), পুরুষের বীর্য বিশ্লেষণ এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব পরীক্ষা করার জন্য এইচএসজি (HSG), এসএসজি (SSG), হাইকোসি (HyCoSy) বা প্রয়োজনে ল্যাপারোস্কোপির মতো পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের আগে করানোর যৌক্তিকতা নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
তাদের ভাষ্য, গর্ভধারণের পরিকল্পনার শুরুতেই ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ, রক্তের গ্রুপ, থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং ও রুবেলা আইজিজি পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সঠিক ওজন বজায় রাখা এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার নিয়মিত সহবাসেরও পরামর্শ দেন তারা।
অন্যদিকে, টর্চ (TORCH) পরীক্ষা, ছয় মাস চেষ্টা করার আগেই এএমএইচ, এইচএসজি বা বীর্য বিশ্লেষণ করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লেট্রোজোল বা ক্লোমিফিন সেবন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরীক্ষা বা ওষুধ অযথা ব্যবহার করলে ভুল ব্যাখ্যা থেকে রোগীর মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ খুলে যেতে পারে।
বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. সুজয় দাসগুপ্ত বলেন, “এএমএইচ বা অন্যান্য পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিক ফল এলেই যে একজন নারী স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে পারবেন না, এমন ধারণা ভুল। অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার ফলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হয়ে রোগীরা আইভিএফের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার দিকে চলে যান, যদিও তাদের স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “লেট্রোজোল বা ক্লোমিফিনের মতো ওষুধ প্রয়োজন ছাড়া মাসের পর মাস ব্যবহার করা উচিত নয়। একই ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনের ফলে পরবর্তী সময়ে প্রকৃত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় তাড়াহুড়ো না করে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী সঠিক সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পন্থা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় অযথা পরীক্ষা বা ওষুধ নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যায়ন এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শই একটি সুস্থ ও নিরাপদ গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।