স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
চোখের চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন রোগীরা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিদিন ভোরেই তৈরি হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ফটক খোলার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট কাউন্টারের দিকে ছুটছেন শত শত রোগী ও স্বজন। কে আগে পৌঁছাবেন-এই প্রতিযোগিতায় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে এক নারীকে মাটিতে পড়ে যেতেও দেখা যায়। ঘটনাটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি তাদের ভোগান্তিকেও সামনে এনেছে।
দেশের অন্যতম প্রধান সরকারি বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। চোখের জটিল রোগের চিকিৎসা, চিকিৎসক তৈরির শিক্ষা কার্যক্রম এবং উচ্চতর গবেষণার সুযোগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো রোগী ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও রোগীর সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়ায় বহির্বিভাগে দেখা দিয়েছে তীব্র চাপ।
২৫০ শয্যার এই হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। প্রতিদিন বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজারে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যেখানে দৈনিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগীকে সেবা দেওয়ার মতো কাঠামো রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ।
ফলে অনেক রোগীকে ভোররাত থেকেই হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টিকিট সংগ্রহ, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ পাওয়ার প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। রোগীদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও দেখা দেয় সমন্বয়হীনতা ও হয়রানির অভিযোগ।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ.এস.এম.এম. কাদীর জানিয়েছেন, টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রোগীদের চাপ কমাতে হাসপাতালের সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ তলা একটি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন অবকাঠামো চালু হলে রোগীদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে শুধু অবকাঠামো বাড়ালেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশের জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চক্ষু চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শুধু চক্ষু হাসপাতাল নয়, একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালেও। দেশের অন্যতম প্রধান স্নায়ুরোগ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটিতে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা আসেন। কিন্তু রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে এখানেও দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে।
৫০০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নুরুজ্জামান আশা করছেন, বর্ধিত সক্ষমতা চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কমাতে হলে চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। শুধু বড় হাসপাতাল নির্মাণ নয়, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীর ভিড় ও ভোগান্তি কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
চিকিৎসার জন্য মানুষের শেষ ভরসাস্থল সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে যদি রোগীদের জীবন বাজি রেখে টিকিটের জন্য দৌড়াতে হয়, তবে তা শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়—এটি পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনবান্ধব ও সুশৃঙ্খল করতে এখন প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন।