স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৮ পি এম

একটি সূঁচ, কিছু অশ্রু ও সিজারিয়ান মায়েদের অদেখা সাহসের গল্প

ছবি: সংগৃহীত

হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন পরিবারের সদস্যরা। আর ভেতরে একজন মা শুয়ে আছেন অপারেশন টেবিলে। তাঁর চোখে ভয়, মনে হাজারো প্রশ্ন, কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে একটাই প্রার্থনা -"আমার সন্তান যেন সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখে।"

সেই মুহূর্তে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে একটি ছোট্ট স্পাইনাল অ্যানেস্থেশিয়ার সূঁচ। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি চিকিৎসা উপকরণ। কিন্তু একজন সিজারিয়ান মায়ের কাছে এই সূঁচটি সাহসের প্রতীক, আত্মত্যাগের প্রতীক এবং নিঃস্বার্থ মাতৃত্বের এক নীরব সাক্ষী।

একটি শিশুর জন্ম কখনোই সহজ নয়। স্বাভাবিক প্রসব হোক কিংবা সিজারিয়ান-দুই ক্ষেত্রেই একজন মা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন জীবনকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। কিন্তু সিজারিয়ান নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকেই মনে করেন, এটি সহজ পথ। কেউ কেউ এমনও বলেন, "কেটে সন্তান জন্ম দিয়েছে, এতে আবার কষ্ট কী?"

বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সিজারিয়ান অপারেশনের আগে একজন মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অপারেশনের ভয়, অজানা শঙ্কা, নিজের জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা, নবজাতকের সুস্থতা নিয়ে উৎকণ্ঠা, সব মিলিয়ে তাঁর ভেতরে এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলতে থাকে। অথচ সেই যুদ্ধের খবর খুব কম মানুষই রাখেন।

স্পাইনাল অ্যানেস্থেশিয়ার জন্য যখন সূঁচটি মেরুদণ্ডে প্রবেশ করানো হয়, তখন অনেক মা ভয় আর অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠেন। এরপর শুরু হয় অপারেশন। শরীরের নিচের অংশ অবশ থাকলেও তিনি সচেতন থাকেন। চারপাশের মানুষের কথাবার্তা শোনেন, চিকিৎসকদের ব্যস্ততা অনুভব করেন, আর অপেক্ষা করেন সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত প্রথম কান্নার শব্দটির জন্য।

হঠাৎ যখন নবজাতকের কান্না ভেসে আসে, তখন অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা সেই মায়ের চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু। সেই অশ্রু কষ্টের নয়, তৃপ্তির। কারণ তিনি জানেন, তাঁর সমস্ত যন্ত্রণা সার্থক হয়েছে।

কিন্তু গল্পটি এখানেই শেষ নয়।

অপারেশনের পর শুরু হয় আরেকটি কঠিন অধ্যায়। সেলাইয়ের ব্যথা, হাঁটতে না পারা, বিছানা থেকে উঠতে কষ্ট, শিশুকে কোলে নেওয়ার সংগ্রাম, রাতের পর রাত নির্ঘুম থাকা, সবকিছুর মাঝেও একজন মা তাঁর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ব্যথা ভুলে যান।

চিকিৎসকদের মতে, সিজারিয়ান একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। তাই এর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত ব্যথা, দুর্বলতা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকাটা স্বাভাবিক। তবুও অধিকাংশ মা নিজের বিশ্রামের কথা না ভেবে সন্তানের যত্নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার বেড়েছে। এর পেছনে যেমন জটিল গর্ভাবস্থা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, শিশুর অস্বাভাবিক অবস্থান বা জরুরি চিকিৎসাগত কারণ রয়েছে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, সিজারিয়ান তখনই হওয়া উচিত, যখন সেটি মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয়।

তবে একটি বিষয় কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয়, সন্তান জন্মদানের পদ্ধতি দিয়ে কোনো মায়ের ভালোবাসা, সাহস বা মাতৃত্বকে বিচার করা যায় না।

যে মা স্বাভাবিক প্রসব করেন, তিনিও একজন যোদ্ধা। আর যিনি সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন, তিনিও সমান সাহসী। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই একজন মা নিজের শরীর, স্বাচ্ছন্দ্য, ঘুম, এমনকি নিজের জীবনের ঝুঁকিকেও পেছনে রেখে একটি নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন।

অনেক সিজারিয়ান মা এখনও সামাজিক কটূক্তির শিকার হন। কেউ বলেন, "স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেনি।" কেউ বলেন, "এটা তো সহজ ছিল।" অথচ এই মন্তব্যগুলোর পেছনে নেই অপারেশন থিয়েটারের সেই কয়েক ঘণ্টার ভয়, নেই সেলাইয়ের ব্যথায় রাত জেগে কাটানো দিনের গল্প, নেই সন্তানের মুখ দেখে নিজের যন্ত্রণা ভুলে যাওয়া এক মায়ের নীরব অশ্রু।

সমাজের উচিত এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। একজন মাকে তাঁর প্রসবের পদ্ধতি দিয়ে নয়, তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ এবং সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ সংগ্রামের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা।

সেই ছোট্ট স্পাইনাল সূঁচটি তাই কেবল একটি চিকিৎসা যন্ত্র নয়। এটি একজন মায়ের অসীম সাহসের প্রতীক। এটি একটি নতুন জীবনের সূচনার সাক্ষী। এটি এমন এক ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি, যার কোনো তুলনা হয় না।

পৃথিবীর প্রতিটি সিজারিয়ান মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। কারণ তাঁরা শুধু একজন শিশুর জন্ম দেন না, প্রতিটি অপারেশন থিয়েটারে জন্ম নেয় আরেকজন মা, যিনি নিজের সব ব্যথা, ভয় আর অশ্রুকে জয় করে ভালোবাসার নতুন ইতিহাস রচনা করেন।

মাতৃত্ব কোনো প্রতিযোগিতা নয়। স্বাভাবিক প্রসব হোক বা সিজারিয়ান, প্রতিটি মায়ের যাত্রাই সম্মানের, প্রতিটি মায়ের ত্যাগই অনন্য, আর প্রতিটি মায়ের ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা।