স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
দেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের একটি উঠানে বসে আছেন একদল মা। তাদের কোলে নবজাতক ও ছোট ছোট শিশু। কেউ এসেছে নিয়মিত টিকা নিতে, কেউ গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিতে, আবার কেউ এসেছে সন্তানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী। হাতে টিকার বাক্স, মুখে সচেতনতার বার্তা।
এই দৃশ্যটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায়। আর এসব কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে ‘সূর্যের হাসি’ নেটওয়ার্কের ক্লিনিকসমূহের নিরলস প্রচেষ্টা। মাত্র পাঁচ বছরে ৫০ লাখ টিকা দিয়ে মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও রয়ে গেছে দৃষ্টির আড়ালে!
বর্তমানে দেশে হাম রোগের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকা গ্রহণই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই বাস্তবতায় সরকারের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে সূর্যের হাসি ক্লিনিকগুলো। প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন বিনামূল্যে হাম-রুবেলা প্রতিরোধী টিকা, যা শিশুদের জীবনরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে সূর্যের হাসির কার্যক্রম শুধু হাম-রুবেলা টিকাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর সহযোগী হিসেবে এবং নিজস্ব উদ্যোগে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশুকে জীবনরক্ষাকারী টিকা প্রদান করছে তারা।
যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টঙ্কার, হেপাটাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, পোলিও, হাম, রুবেলা, ডায়রিয়া, চিকেনপক্স এবং কলেরার মতো নানা প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সূর্যের হাসির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫০ লাখ টিকা প্রদান করা হয়েছে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের সময় মাঠপর্যায়ে দেওয়া অনেক টিকার তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না।
স্বাস্থ্যসেবার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ২৯ বছর আগে। ইউএসএইডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত সূর্যের হাসি ক্লিনিকসমূহ ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। শহর, মফস্বল এবং দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক লাখো মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
শিশুদের পাশাপাশি কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকাদান, ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধ এবং হেপাটাইটিসের মতো রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের জন্য গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতকের সেবাও প্রদান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সূর্যের হাসির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাদান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব।
বর্তমান হাম পরিস্থিতিতে সূর্যের হাসি অভিভাবকদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে, শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সব টিকা সময়মতো গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিকটস্থ সূর্যের হাসি ক্লিনিক, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা অনুমোদিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
একটি শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। আর সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যবান করে তুলতে বছরের পর বছর ধরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে সূর্যের হাসি। লাখো শিশুর মুখে সুস্থতার হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টাই আজ প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।