স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১২ পি এম

কাজ হারানোর ভয়ে জরায়ু কেটে বাদ দিচ্ছেন ভারতের নারী আখশ্রমিকরা

ছবি: সংগৃহীত

ডেস্ক সংবাদ: কাজ হারানোর ভয়, ঋণের বোঝা ও অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার কারণে ভারতের মহারাষ্ট্রের বহু নারী আখশ্রমিক জরায়ু অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের কথা ভাবছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে জরায়ু অপসারণ করেছেন।

জীবিকা নির্বাহের তাগিদে প্রজননস্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ঝুঁকি উপেক্ষা করে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন এসব নারী।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের মহারাষ্ট্রের বিদ জেলার নারী আখশ্রমিকদের এমন দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজে নিয়োজিত। তাদের অনেককে দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। দৈনিক মজুরি প্রায় ৪০০ রুপি। স্বামী-স্ত্রী মিলে দলবদ্ধভাবে কাজ করেন অনেক শ্রমিক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আখ কাটা, সংগ্রহ এবং ট্রাক ও ট্রাক্টরে বোঝাই করার কাজ চলে।

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির আখের একটি অংশ কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো আন্তর্জাতিক কোমল পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থায় যায়। তবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের একটি অংশকে চরম অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হচ্ছে।

মহারাষ্ট্রের বিদ জেলার বহু নারী শ্রমিক মৌসুমি কাজের জন্য নিজেদের এলাকা ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে যান। কাজের জায়গায় অস্থায়ী তাঁবুতে থাকতে হয় তাদের। অনেক ক্যাম্পে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই।

মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা হলেও তাদের কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ সীমিত। একদিন কাজ না করলে মজুরি কাটা যায়। পাশাপাশি শ্রমিকদের অগ্রিম দেওয়া অর্থ বা দাদন পরিশোধের চাপও রয়েছে। ফলে ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা এমনকি গর্ভপাতের সময়ও অনেক নারীকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এই পরিস্থিতিতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার কাজের ঘাটতি অন্য শ্রমিকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির আর্থিক দায়ও অসুস্থ শ্রমিকের ওপর চাপানো হয়।

প্রতিবেদনে পূর্ণিমা নামের এক নারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসহনীয় ব্যথা সহ্য করার পর তিনি জরায়ু অপসারণের কথা ভাবছেন। তার আশঙ্কা, ভারী কাজ চালিয়ে গেলে শারীরিক কষ্ট আরও বাড়বে। কিন্তু কাজ ছেড়ে দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও তার নেই।

আরেক শ্রমিক সবিতা ২০২৫ সালের মার্চে অসুস্থতা ও পেটব্যথার কারণে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পরও রক্তপাত ও ব্যথা অব্যাহত রয়েছে। পরে পুনেতে চিকিৎসা নিতে গেলে চিকিৎসকেরা তার শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কথা জানান। অস্ত্রোপচারের আগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব নথি চেয়েও তিনি পাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিদ জেলার বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে আখ কাটার মৌসুমি কাজের ওপর। শ্রমিকদের ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। কাজ শুরুর আগে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়, যা পরে শ্রমের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। স্থানীয়ভাবে আখ কাটার কাজে নিয়োজিত স্বামী-স্ত্রীর দলকে ‘কয়তা’ বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি দম্পতির কাছ থেকে দিনে গড়ে অন্তত তিন টন আখ কাটার প্রত্যাশা করা হয়। নির্ধারিত পরিমাণ আখ সরবরাহ করতে না পারলে আয় কমে যায়। ফলে অসুস্থতা বা শারীরিক সমস্যার কারণে কাজের গতি কমলেও শ্রমিকদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

পূর্ণিমা জানান, গত তিন বছরে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করার পর তিনি জরায়ু অপসারণের কথা বিবেচনা করছেন। এ অস্ত্রোপচারের ব্যয় মেটাতেও তাকে নতুন করে ঋণ নিতে হতে পারে। তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসার খরচ ও জীবিকার অনিশ্চয়তা মিলিয়ে নারীরা ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ছেন।

নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত না করে নারীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানে যথাযথ চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে সব অস্ত্রোপচারই অপ্রয়োজনীয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; জরায়ু অপসারণের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসাগত কারণ বিবেচনা করা জরুরি।

২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের পরিচালিত এক জরিপে বিদ জেলার আখ কাটার কাজে যুক্ত ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জরিপে তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণের তথ্য উঠে আসে। অস্ত্রোপচার করা নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি পরবর্তী সময়ে শারীরিক বা মানসিক সমস্যা ও যন্ত্রণার কথা জানান।

নারী অধিকারকর্মী সঙ্গীতা চৌহান ও রাজনীতিবিদ নীলম গোরহে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু আশাকর্মীর বিরুদ্ধে অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে মহারাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট আশাকর্মীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জরায়ু অপসারণের উচ্চ হার ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের পর মহারাষ্ট্র সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্ট আঞ্চলিক সরকারকে শ্রমিকদের নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একই বছরের নভেম্বরে হালনাগাদ তথ্যসহ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রকাশিত হয়নি বলে দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে কাজ করা শ্রমিকদের দাবি, তাদের জীবনযাত্রা ও কর্মপরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। পূর্ণিমা ও সবিতা দুজনেই সরকারি সহায়তা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ঠিকাদারদের দাবি, তারা কাউকে জরায়ু অপসারণে বাধ্য করেন না। তবে শ্রমিকদের বেতনসহ ছুটির ব্যবস্থা নেই বলে তারাও স্বীকার করেছেন। তাদের যুক্তি, আখের পরিমাণের ওপর আয় নির্ভর করায় শ্রমিক কম কাজ করলে সামগ্রিক উৎপাদন কমে যায়।

অন্যদিকে কোকা-কোলা জানিয়েছে, উন্নয়ন সংস্থা সলিডারিডাডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে শ্রমিকদের সুপেয় পানি, শৌচাগার, বিশ্রামাগার, কাজের উপযোগী সরঞ্জাম ও নারী স্বাস্থ্যসামগ্রীর সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ উদ্যোগে ইতোমধ্যে এক লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এ বিষয়ে পেপসিকোর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তাদের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

পূর্ণিমার মতো অনেক নারী এখনো ব্যথা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন—এই আশায় তারা অস্ত্রোপচারের কথা ভাবলেও এর ব্যয় মেটাতে নতুন ঋণ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জীবিকা, শ্রমিকের অধিকার এবং প্রজননস্বাস্থ্যের এই সংকট সমাধানে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চিকিৎসাসেবা, বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং ঋণনির্ভর শ্রমব্যবস্থার সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অধিকারকর্মীরা।

তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট।