স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ পি এম

‘বাংলাদেশের মতো কম দামে ওষুধ আর কোথাও নেই’

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ওষুধের দাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও দেশের ওষুধশিল্পের অন্যতম শীর্ষ উদ্যোক্তা ও রেনাটা পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবিরের দাবি, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধের দাম এখনো অত্যন্ত কম।

তাঁর ভাষ্য, ওষুধের দাম কম রাখার পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা টেকসই রাখাও জরুরি।

সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, তিনি ৬০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। এসব দেশের বাজার পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর দাবি, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে ওষুধের দাম কম।

বিশেষ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এর আগে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘দুনিয়ার মধ্যে ওষুধের দাম সবচেয়ে কম বাংলাদেশে।’ একই সঙ্গে ওষুধশিল্পকে কেবল দাম কমানোর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে উৎপাদন খাতের বাস্তবতা, বিনিয়োগ, কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কায়সার কবিরের মতে, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে আসছে। পাশাপাশি দেশের তৈরি ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে এই খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ওষুধের দাম কমানোর জন্য কেবল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ না করে দরিদ্র রোগীদের জন্য সরকারের সরাসরি ভর্তুকি বা বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সহায়তা পাবেন এবং উৎপাদকদের ওপর কৃত্রিমভাবে দাম কমানোর চাপও কমবে।

দেশে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেছেন রেনাটা পিএলসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে ১১৭টি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বর্তমানে ওই তালিকার অধিকাংশ ওষুধই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। তাই ওষুধের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার।

তবে ওষুধের দাম নিয়ে কায়সার কবিরের বক্তব্যের বিপরীতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও ভিন্ন মত রয়েছে। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় একটি অংশ ওষুধ কিনতে ব্যয় হয়।

ফলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে উৎপাদক, সরকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও ওষুধের সহজলভ্যতা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধের দাম কম রাখাই যথেষ্ট নয়; বাজারে মানসম্পন্ন ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

অন্যদিকে, ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদন খাতকে চাপে রাখা হলে কিছু ওষুধ বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে নির্ধারিত দামে ওষুধ উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে শেষ পর্যন্ত রোগীদেরই সমস্যায় পড়তে হবে।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বর্তমান বাস্তবতায় তাই একদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে উৎপাদকদের জন্য বাস্তবসম্মত মূল্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখা, দুই বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সৈয়দ এস কায়সার কবির আরও মনে করেন, দেশের ওষুধশিল্পের বৈচিত্র্যকরণ ও রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের মান ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াতে উন্নত দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

দেশের ওষুধশিল্প ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। তাই ভবিষ্যতে এই খাতের বিকাশে সাশ্রয়ী মূল্য, মানসম্মত উৎপাদন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ-সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

কায়সার কবিরের বক্তব্যের মূল বিষয়ও সেখানেই-বাংলাদেশে ওষুধের দাম তুলনামূলকভাবে কম হলেও এই মূল্যসাশ্রয়ী ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে উৎপাদকদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রোগীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

তাঁর মতে, রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী ওষুধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নয়; সরকারের নীতি ও সহায়তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।