স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
দেশে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর্মক্ষমতার ক্ষতি বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘অ্যান আনসাস্টেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই ধাপে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের তথ্যও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে গরমের অনুভূতি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার আরও বেশি, রাজধানীতে গরম বেড়েছে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি।
অতিরিক্ত গরমের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ডায়রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট ও প্রচণ্ড অবসাদের মতো সমস্যা বাড়ছে। ফলে অনেক মানুষ নিয়মিত কাজে যেতে পারছেন না। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বিশ্বব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মানুষের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে কাজ হারানোর হার বাড়ে। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রার তুলনায় এ সময়ে একজন মানুষ অতিরিক্ত প্রায় ১ দশমিক ৪ দিন কাজ হারাতে পারেন।
আয়ের দিক থেকেও ক্ষতির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে কম আয়ের মানুষ গ্রীষ্মে গড়ে ১ দশমিক ৭ দিন কাজ হারিয়েছেন। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১ দশমিক ১ দিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে অদক্ষ শ্রমিকদের কাজ হারানোর হারও তুলনামূলক বেশি।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বয়সভেদেও ক্ষতির পার্থক্য দেখা গেছে। ৩৬ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষ গড়ে আড়াই দিন এবং ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীরা ২ দশমিক ১ দিন অতিরিক্ত কাজ হারিয়েছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি আরও বেশি, তাঁরা গড়ে ৬ দশমিক ৩ দিন অতিরিক্ত কাজ হারিয়েছেন।
হৃদ্রোগ, ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও কর্মদিবস হারানোর হার বেশি। হৃদ্রোগীদের গড়ে ৪ দশমিক ৭ দিন এবং দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্তদের ৩ দশমিক ৯ দিন অতিরিক্ত কাজ হারানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ছেন শ্রমজীবী মানুষ। ঢাকার কারওয়ানবাজারের দিনমজুর পারভিন আক্তারের মতো অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে কাজে যেতে পারছেন না। দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ হওয়ায় একদিন কাজে অনুপস্থিত থাকলেই তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অসুস্থতার পাশাপাশি পরিবারের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ ও সবুজ ও জলাভূমি কমে যাওয়াও বড় কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালামের মতে, অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণ এবং দূষণ তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া ও ইটভাটাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেনও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঢাকায় জলাভূমি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাজধানীর জলাভূমি ৬৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে নগরীর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কোনো কোনো এলাকায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জলাভূমির প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে, যা নগরীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, গরমের কারণে শুধু শ্রমজীবী মানুষই নয়, সব পেশার মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে পাখা, এসি বা অন্যান্য শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহারের খরচও বাড়ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষতি কমাতে নগর পরিকল্পনায় সবুজ ও জলাভূমি সংরক্ষণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত গরমের সময়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অন্যথায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কর্মদিবসের ক্ষতি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও আরও বাড়তে পারে।