স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ পি এম

ডেঙ্গুতে জ্বর কমলেও কেন বাড়তি সতর্কতা জরুরি

ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলে অনেকেই মনে করেন, রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু বাস্তবে জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ সময় কিছু রোগীর শরীরের রক্তনালি থেকে প্লাজমা বের হয়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। সময়মতো এই জটিলতা শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা না পেলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে, এমনকি শক দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গুতে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে তাই পানিশূন্যতা প্রতিরোধ, রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বিপৎসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। বিশেষ করে জ্বর শুরুর তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থার দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে।

জ্বর কমলেও কেন বিপদের আশঙ্কা থাকে

ডেঙ্গুর সংকটপূর্ণ পর্যায় সাধারণত জ্বর শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এ সময় রক্তনালি থেকে প্লাজমা বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমতে পারে। ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে রক্তচাপ নেমে যেতে পারে এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় একে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম বলা হয়।

তাই জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত হয়েছেন, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

জ্বরের প্রথম দিন থেকেই পর্যাপ্ত তরল পান করুন

উচ্চ জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব ও ক্ষুধামন্দার কারণে ডেঙ্গু রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এ জন্য অল্প অল্প করে বারবার তরল পান করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, লেবুর শরবত ও বাসায় তৈরি ফলের রস দেওয়া যেতে পারে।

তবে প্রত্যেক রোগীর জন্য একই পরিমাণ তরল প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং হৃদ্‌যন্ত্র বা কিডনির সমস্যা আছে কি না, তা বিবেচনায় তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত তরলও বিপজ্জনক হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে দিতে হবে।

রক্তচাপ, পালস ও প্রস্রাবের দিকে নজর দিন

ডেঙ্গুতে শকের ঝুঁকি শনাক্ত করতে রোগীর রক্তচাপ ও পালসের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। রক্তচাপের ওপরের ও নিচের সংখ্যার পার্থক্যকে পালস প্রেসার বলে। যেমন, রক্তচাপ ১২০/৮০ হলে পালস প্রেসার ৪০। এই পার্থক্য কমে যাওয়া, বিশেষ করে ২০ বা তার নিচে নেমে আসা, শকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। তবে শুধু এই মাপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

পাশাপাশি রোগী নিয়মিত প্রস্রাব করছেন কি না, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা কয়েক ঘণ্টা প্রস্রাব না হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যেসব বিপৎসংকেত দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে—

  • তীব্র বা একটানা পেটব্যথা।
  • বারবার বমি হওয়া।
  • নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া।
  • রক্তবমি বা কালো পায়খানা।
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব।
  • শ্বাসকষ্ট।
  • হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরা।
  • প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া বা শুধু পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই জরুরি।

ডেঙ্গু শনাক্তে কোন পরীক্ষা করবেন

জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা সাধারণত জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, IgM ও IgG অ্যান্টিবডি পরীক্ষার উপযোগিতা রোগের সময়কাল ও সংক্রমণের ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে।

তাই সবার ক্ষেত্রে তিনটি পরীক্ষা একসঙ্গে করানো বাধ্যতামূলক নয়। রোগীর উপসর্গ, জ্বরের দিন এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্বাচন করা উচিত। প্রাথমিক পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক পরবর্তী পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। বিপৎসংকেত দেখা দিলে পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় চিকিৎসা নিতে দেরি করা যাবে না।

প্লাটিলেট কমলেই কি আতঙ্কিত হতে হবে

ডেঙ্গুতে রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে। প্লাটিলেট রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। তবে শুধু প্লাটিলেট কমে যাওয়াই ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থতা বা মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়। শক, গুরুতর রক্তক্ষরণ ও বিভিন্ন অঙ্গের জটিলতাও প্রাণঘাতী হতে পারে।

রোগীর রক্তচাপ, পালস, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তক্ষরণের লক্ষণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হয়। শুধু প্লাটিলেট কম বলে নিয়মিত প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না; চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।

পেঁপে পাতার রস বা নির্দিষ্ট কোনো খাবার খেলে দ্রুত প্লাটিলেট বাড়ে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে পুষ্টি বজায় রাখতে পাকা পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লেবু, আমলকী, ডালিমসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবার পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করলেও ডেঙ্গুর চিকিৎসার বিকল্প নয়।

ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া।

জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল গ্রহণ করা যায়। তবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু হলে এসব ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড গ্রহণ করা উচিত নয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, ফুলের টব ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশারি ব্যবহার করা জরুরি।

ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়। বিশেষ করে জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর অবস্থার দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। সঠিক সময়ে বিপৎসংকেত শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।