স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯ পি এম

ডেঙ্গুতে জ্বর কমার পরের ৪৮ ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলে অনেকেই মনে করেন, রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু বাস্তবে জ্বর কমার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ সময় কিছু রোগীর শরীর থেকে রক্তনালির তরল অংশ বা প্লাজমা বের হয়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। সময়মতো এই জটিলতা শনাক্ত করে চিকিৎসা না দিলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে, এমনকি শক দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গুতে তাই শুধু জ্বরের দিকে নজর দিলেই হবে না, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে জ্বর শুরুর তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে সতর্ক থাকা জরুরি। এ সময় রোগীর বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

জ্বর কমলেও কেন বিপদের আশঙ্কা থাকে

ডেঙ্গুতে সাধারণত জ্বর কয়েক দিন স্থায়ী হয়। তবে জ্বর কমে যাওয়ার সময় কিছু রোগীর রোগের সংকটপূর্ণ পর্যায় শুরু হতে পারে। এ পর্যায়ে রক্তনালি থেকে প্লাজমা বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমতে পারে। ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে রক্তচাপ নেমে যেতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

এ অবস্থাকে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের দিকে অগ্রসর হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত হয়েছেন, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

ডেঙ্গুতে পর্যাপ্ত তরল পান জরুরি

ডেঙ্গুতে জ্বর, বমি ও খাবারে অরুচির কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এ জন্য রোগীকে অল্প অল্প করে বারবার তরল পান করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন (ওআরএস), ডাবের পানি, স্যুপ, পাতলা ডালের পানি ও বাসায় তৈরি ফলের রস দেওয়া যেতে পারে।

তবে প্রত্যেক রোগীর জন্য একই পরিমাণ তরল প্রয়োজন হয় না। রোগীর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং হৃদ্‌যন্ত্র বা কিডনির সমস্যা আছে কি না, তা বিবেচনা করে তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। অতিরিক্ত তরলও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল দিতে হবে।

যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে—

▪️পেটে তীব্র বা একটানা ব্যথা।

▪️বারবার বমি হওয়া বা কিছুই খেতে না পারা।

▪️নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া।

▪️রক্তবমি বা কালো পায়খানা।

▪️অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব।

▪️হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরা।

▪️প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।

▪️শ্বাসকষ্ট বা শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে শুধু বাড়িতে তরল পান করিয়ে অপেক্ষা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

প্লাটিলেট কমলেই কি আতঙ্কিত হতে হবে

ডেঙ্গুতে রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে। প্লাটিলেট রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যাওয়াই রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ার একমাত্র নির্দেশক নয়।

রোগীর রক্তচাপ, পালস, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্তক্ষরণের লক্ষণ এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হয়। শুধু প্লাটিলেট কম বলে নিয়মিত প্লাটিলেট সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না; চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।

পেঁপে পাতার রস বা মিষ্টি কুমড়া খেলে দ্রুত প্লাটিলেট বাড়ে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন, তবে কোনো খাবার ডেঙ্গুর চিকিৎসার বিকল্প নয়।

ডেঙ্গুতে ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। তবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও ডাইক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু হলে এসব ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েডও গ্রহণ করা উচিত নয়।

জ্বর হলে কখন পরীক্ষা করবেন

জ্বর দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বেশি কার্যকর। অন্যদিকে, IgM ও IgG অ্যান্টিবডি পরীক্ষার উপযোগিতা রোগের সময়কাল ও সংক্রমণের ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। তাই সবার ক্ষেত্রে তিনটি পরীক্ষা একসঙ্গে করানো বাধ্যতামূলক নয়। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও জ্বরের দিন অনুযায়ী উপযুক্ত পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি ব্যবহার করা জরুরি।

ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরের ৪৮ ঘণ্টা অবহেলা করবেন না। রোগীর অবস্থার দিকে নজর রাখুন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।