স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
রান্না করতে গিয়ে ছুরি দিয়ে আঙুল কেটে গেছে, পায়ে পেরেক ফুটেছে কিংবা হাতে সামান্য ক্ষত হয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই টিটেনাসের টিকা নিয়ে নেন। কারও কারও ধারণা, যেকোনো কাটাছেঁড়ার পরই টিটেনাসের টিকা নেওয়া জরুরি। আবার কেউ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকা নিতে অবহেলা করেন। কিন্তু আসলে কখন টিটেনাসের টিকা নেওয়া প্রয়োজন? বারবার এই টিকা নিলে কি শরীরের ক্ষতি হতে পারে?
টিটেনাস একটি গুরুতর রোগ, যা প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রতিবার কেটে গেলেই নতুন করে টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় ক্ষতের ধরন এবং আগে টিকা নেওয়ার ইতিহাস বিবেচনা করে।
টিটেনাস হয় ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি নামের ব্যাকটেরিয়ার বিষের কারণে। এই ব্যাকটেরিয়ার স্পোর মাটি, ধুলাবালি ও পরিবেশের বিভিন্ন স্থানে থাকতে পারে। ক্ষতের মাধ্যমে স্পোর শরীরে প্রবেশ করে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিষ তৈরি করতে পারে। এর ফলে চোয়াল শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশিতে ব্যথাযুক্ত খিঁচুনি, গিলতে অসুবিধা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
শুধু মরিচা ধরা পেরেক থেকেই টিটেনাস হয়, এমন ধারণা ঠিক নয়। পরিষ্কার দেখালেও কোনো ধারালো বস্তু বা দূষিত ক্ষতের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যাঁদের টিটেনাসের প্রাথমিক টিকাদান সম্পূর্ণ হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্ষতের ধরন অনুযায়ী বুস্টার ডোজ নেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়।
সাধারণভাবে, পরিষ্কার ও সামান্য ক্ষতের ক্ষেত্রে শেষ টিকার পর ১০ বছর বা তার বেশি এবং নোংরা, গভীর বা গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় পেরিয়ে গেলে বুস্টার টিকা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, যাঁদের টিকাদান সম্পূর্ণ হয়নি, টিকার ইতিহাস জানা নেই কিংবা আগে টিকা নেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্ষতের ধরন অনুযায়ী দ্রুত টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিছু দূষিত বা গুরুতর ক্ষতের ক্ষেত্রে টিকার পাশাপাশি টিটেনাস ইমিউন গ্লোবিউলিন (টিআইজি) দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ক্ষত হওয়ার পর নিজের সিদ্ধান্তে টিকা নেওয়া বা বাদ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
টিটেনাসের টিকা সাধারণত নিরাপদ। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার টিকা নিলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন—
ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা ও ফোলা: টিকা নেওয়া হাত লাল হয়ে যেতে পারে, ব্যথা করতে পারে বা ফুলে যেতে পারে।
হালকা জ্বর ও ক্লান্তি: কারও কারও মাথাব্যথা, শরীর খারাপ লাগা বা সামান্য জ্বর হতে পারে।
তীব্র স্থানীয় প্রতিক্রিয়া: অল্প সময়ের মধ্যে বারবার বুস্টার নিলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইনজেকশনের স্থানে বেশি ব্যথা, ফোলা ও লালচে ভাব দেখা দিতে পারে।
তবে বারবার টিকা নিলেই শরীরের স্থায়ী ক্ষতি হবে, এমন নয়। মূল বিষয় হলো, প্রয়োজন ছাড়া ঘন ঘন টিকা না নেওয়া এবং আগের টিকার তারিখ যাচাই করা।
প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকা না নিলে টিটেনাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। রোগটি একবার হলে চিকিৎসা কঠিন হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। তাই গভীর ক্ষত, পেরেক বা ধারালো বস্তু ফুটে যাওয়া, মাটি বা ময়লা লাগা ক্ষত এবং পশুর কামড়ের মতো ঘটনায় অবহেলা করা উচিত নয়।
ক্ষত হলে প্রথমে পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে দৃশ্যমান ময়লা সরাতে হবে। এরপর ক্ষতের ধরন ও টিকার ইতিহাস অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শুধু অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে টিটেনাস প্রতিরোধ করা যায় না।
ক্ষত গভীর হলে, পেরেক ফুটলে, ক্ষতে মাটি বা ময়লা ঢুকলে কিংবা শেষ টিকা কবে নিয়েছেন তা জানা না থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। টিটেনাসের লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না।
মনে রাখবেন, প্রতিবার কেটে গেলেই টিটেনাসের টিকা নেওয়া জরুরি নয়। আবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিকা না নেওয়াও বিপজ্জনক। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য ক্ষতের ধরন, আগের টিকার ইতিহাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।