স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৩ পি এম

বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বড় বাধা স্বাস্থ্য খাতের ৭৩ হাজার শূন্য পদ

ফাইল ছবি

ঢাকা: তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং পর্যায়ক্রমে ১ লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাস্থ্য খাতের বড় জনবল সংকট এখন সামনে এসেছে।

দেশের তিন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বর্তমানে শূন্য। ফলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের এই জনবল ঘাটতি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে মোট অনুমোদিত পদ রয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৪টি। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৪৫টি পদ শূন্য। অর্থাৎ মোট অনুমোদিত পদের ৩১ দশমিক ২১ শতাংশেই বর্তমানে কোনো জনবল নেই।

এ অবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে একদিকে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান শূন্য পদগুলোও দ্রুত পূরণ করতে হবে।

দীর্ঘদিনের নিয়োগ জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে এই বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট কাটাতে আগামী তিন মাসের মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ চিকিৎসক ও ৫ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ১৮৪ জন চিকিৎসক আগামী ৭ সেপ্টেম্বর কাজে যোগ দেবেন। তাঁদের মধ্যে ১৬৫ জন সহকারী সার্জন এবং ১৯ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন।

শুধু চিকিৎসক ও নার্স নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য পদেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে ২০ হাজার ৮১৬টি এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৩ হাজার ৩৮৯টি পদ শূন্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৭১৪।

শূন্য পদ পূরণে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। গত ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী দেশের সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জনবল নিয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ৩০ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রশাসন-৩ (মনিটরিং ও সমন্বয়) শাখা থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর, সংস্থা ও বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শূন্য পদের হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়। নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে এসব তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের গত ১৪ জুলাইয়ের মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্তের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠানের জনবল ঘাটতি পূরণে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। প্রাথমিকভাবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। জনবল নিয়োগের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। দ্রুতই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদন গ্রহণ করা হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে শূন্য পদের ছাড়পত্র নিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগের আবেদনকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিয়োগ শেষ করার কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ১ হাজার ৮৫৫টি পদে জনবল নিয়োগের জন্য আগে দেওয়া ছাড়পত্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব পদে নিয়োগের ছাড়পত্র ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর মধ্যে অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে ১৭ ক্যাটাগরির ১ হাজার ৬৬৭টি এবং জেলা পর্যায়ে চার ক্যাটাগরির ১৮৮টি পদ রয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

ইশতেহারে পর্যায়ক্রমে অন্তত ১ লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী হওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পর্যায়ক্রমে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিদ্যমান শূন্য পদে জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের এই উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বড় প্রশ্ন এখন বাস্তবায়নের গতি নিয়ে। অনুমোদিত পদের ৩১ শতাংশের বেশি শূন্য থাকা অবস্থায় শুধু নতুন নিয়োগের ঘোষণা নয়, বিদ্যমান শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করাই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

কারণ নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করতে হলে শুধু পরিকল্পনা ও ঘোষণা নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবলকে দ্রুত তৃণমূলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে কাজে যুক্ত করা। সেই জায়গায় ৭৩ হাজারের বেশি শূন্য পদই এখন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।