স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৭ এএম

কাঁঠালের বীজে লুকিয়ে থাকা অমিত সম্ভাবনা আবিস্কার, বাংলাদেশের পেটেন্ট লাভ!

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁঠালের সমারোহ দেখা যায়। জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের কদর থাকলেও এর একটি বড় অংশ প্রতিবছর অপচয় হয়। বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ, খোসা ও আঁশের মতো অংশগুলো সাধারণত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এই বর্জ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান এবং নতুন শিল্পের সম্ভাবনা।

সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা। কাঁঠালের বীজ থেকে উচ্চমাত্রার খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান বা মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরির একটি অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারা। ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্ট লাভ করেছে, যা দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের রাজধানী বলা হয় গাজীপুরকে। বিশেষ করে শ্রীপুর ও কাপাসিয়ার লাল মাটিতে উৎপাদিত কাঁঠাল দেশজুড়ে পরিচিত। প্রতি বছর গাজীপুরসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে ভরা মৌসুমে অনেক কাঁঠাল নষ্ট হয়ে যায়। এর সঙ্গে বীজ, খোসা ও অন্যান্য অবশিষ্টাংশও বর্জ্যে পরিণত হয়।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এমদাদুল হক এবং তাঁর স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন দীর্ঘ তিন বছর গবেষণা চালান। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গবেষণার ফল হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তারা কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সফল হন।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, 'গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' নামে নতুন যাত্রা শুরুর পর এটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পেটেন্টপ্রাপ্ত প্রযুক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১টিতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ শুকনো কাঁঠালের বীজে খনিজ উপাদানের পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই পরিমাণ ৩৩ শতাংশেরও বেশি ঘনীভূত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ মূল উপাদানের তুলনায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ বেশি খনিজসমৃদ্ধ একটি কনসেন্ট্রেট পাওয়া যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ু ও পেশির কার্যক্রম এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ উপাদান অপরিহার্য। অথচ এসব উপাদানের ঘাটতি এখনও দেশের বহু মানুষের অপুষ্টির অন্যতম কারণ। কাঁঠালের বীজ থেকে তৈরি এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করলে সহজেই খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জন নয়; বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় এটি একটি নতুন মাইলফলক। আমাদের গবেষকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, ফেলে দেওয়া কৃষিজ বর্জ্যও উচ্চমূল্যের সম্পদে পরিণত হতে পারে। গবেষণাগারের এ উদ্ভাবনকে শিল্পের উপযোগী করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানোই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. এমদাদুল হক বলেন, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে নতুন ধরনের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য তৈরির পথ খুলে যাবে। একই সঙ্গে খাদ্য অপচয় ও পরিবেশ দূষণ কমবে, কাঁঠালভিত্তিক নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কাঁঠালের আরও ভালো মূল্য পাবেন।

বিশ্বজুড়ে এখন কৃষিজ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্ভাবন বাংলাদেশের জন্য একটি সময়োপযোগী সাফল্য। যে কাঁঠালের বীজ এতদিন অবহেলায় ফেলে দেওয়া হতো, সেটিই ভবিষ্যতে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।