স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:৩২ পি এম

শুভ জন্মদিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ...

ছবি: সংগৃহীত

কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে, যাদের পরিচয় কেবল ইট-পাথরের ভবন কিংবা শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের প্রবাহে তারা হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, অর্জন এবং আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ডিএমসি) ঠিক তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসক তৈরির পাশাপাশি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সেবার আদর্শ গড়ে তোলার এক অনন্য পাঠশালা এটি।

আজ সেই গর্বের প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আয়োজিত "ডিএমসি ডে" ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্মের চিকিৎসকদের আবেগ, ভালোবাসা এবং স্মৃতির মিলনমেলা।

ক্যাম্পাসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ফিরে আসে ছাত্রজীবনের অসংখ্য স্মৃতি। পরিচিত ভবন, পুরোনো করিডোর, সবুজ চত্বর, লেকচার থিয়েটার, লাইব্রেরি, হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর, সবকিছু যেন নতুন করে অতীতের দরজা খুলে দেয়। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষক, সিনিয়র, সহপাঠী ও জুনিয়রদের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কারও চুলে বয়সের ছাপ, কারও কাঁধে নতুন দায়িত্ব, কেউ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, আবার কেউ বিশ্বের নানা দেশে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত। কিন্তু ক্যাম্পাসে ফিরে সবার পরিচয় যেন একটাই, আমরা সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ পরিবারের সদস্য।

অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আন্তরিকতা ও আবেগে ভরা। কেউ স্মৃতিচারণ করছিলেন ছাত্রজীবনের সংগ্রামের, কেউ প্রথম ক্লাসের অভিজ্ঞতার, কেউ বা ইন্টার্নশিপের ব্যস্ত দিনগুলোর কথা। অনেকেই বলছিলেন রাতভর ডিউটি, পরীক্ষার চাপ, ওয়ার্ডে রোগী দেখা, শিক্ষকদের কঠোর কিন্তু স্নেহময় নির্দেশনা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য আনন্দঘন মুহূর্তের কথা। এসব স্মৃতি শুধু অতীত নয়, বরং চিকিৎসক হিসেবে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাসও কম গৌরবের নয়। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। এখানকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, জনস্বাস্থ্য এবং দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মহামারি কিংবা জাতীয় সংকট, প্রতিটি সময়েই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছিল মানুষের পাশে।

ডিএমসি শুধু দক্ষ চিকিৎসকই তৈরি করেনি; তৈরি করেছে দায়িত্বশীল নাগরিক, মানবিক মানুষ এবং সমাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্ব। এখানকার শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রোগীর প্রতি সহমর্মিতা, পেশাগত নৈতিকতা, মানবিক আচরণ এবং সংকটের সময় দায়িত্ব পালন, এসব মূল্যবোধও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় শিক্ষা।

৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন সেই ঐতিহ্যকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। নবীন চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ছিল পুরো আয়োজনের মূল সুর।

আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য চিকিৎসকের হৃদয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জন্য রয়েছে এক গভীর টান। কর্মব্যস্ত জীবনের শত দায়িত্বের মাঝেও তাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ করেন গর্বের সঙ্গে। কারণ, এখানেই তাঁরা শিখেছেন মানুষের জীবন বাঁচানোর অঙ্গীকার, সেবার দর্শন এবং চিকিৎসা পেশার প্রকৃত অর্থ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১ বছরের পথচলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার বিকাশ, স্বাস্থ্যসেবার অগ্রযাত্রা এবং অসংখ্য চিকিৎসকের স্বপ্নপূরণের ইতিহাস। এই প্রতিষ্ঠান যত এগিয়েছে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাও তত সমৃদ্ধ হয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আমাদের শুধু অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় না, ভবিষ্যতের প্রতিও নতুন করে দায়বদ্ধ করে। চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ আগামী দিনেও দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।

৮১ বছরের এই গৌরবময় যাত্রায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

শুভ জন্মদিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
মানুষের সেবায়, জ্ঞানের আলোয় এবং মানবতার পথে তোমার পথচলা আরও দীর্ঘ, আরও গৌরবময় হোক।