স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ১৬ জুন ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

একটা সরকারী হাসপাতালের গল্প

কয়েকদিন ধরেই দেশের স্বাস্থ্যখাতে আলোচনার কেন্দ্রে একটি বেসরকারি হাসপাতালের ঘটনা। সেই ঘটনা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, ব্যবসায়িক লোভ এবং নীতির অবক্ষয়ের এক বেদনাদায়ক চিত্র।

কিন্তু একই সময়ে দেশের আরেক প্রান্তে, নীরবে-নিভৃতে লেখা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। আলোচনার বাইরে থাকা সেই গল্পটি কোনো করপোরেট হাসপাতালের নয়; এটি একটি সরকারি হাসপাতালের গল্প। কিছু মানুষের অসাধারণ নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ আর মানবসেবার গল্প।

গল্পটি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের।

হাসপাতালটির অর্থোপেডিক বিভাগে নেই বিশাল অবকাঠামো, নেই ঝাঁ-চকচকে চেম্বার কিংবা বিশাল জনবল। আছে মাত্র দুইটি বহির্বিভাগের কক্ষ। আর সেই দুইটি কক্ষকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার রোগী।

সংখ্যাটি কাগজে লেখা যত সহজ, বাস্তবে তার পেছনের শ্রম ও ত্যাগের গল্প ততটাই বিস্ময়কর।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছেন মাত্র ছয়জন চিকিৎসক। এই ছয়জন মানুষই প্রতিদিন অসংখ্য ব্যথাক্লিষ্ট, দুর্ঘটনায় আহত, চলাফেরায় অক্ষম কিংবা আশাহীন রোগীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন। শুধু রোগী দেখাই নয়, গত এক বছরে তারা প্রায় এক হাজার অস্ত্রোপচারও সম্পন্ন করেছেন।

আমি গত দেড় বছর ধরে শিশু অর্থোপেডিক সার্জারির সঙ্গে যুক্ত। জন্মগত হাড়ের সমস্যা এবং শিশুদের বিভিন্ন ধরনের জটিল হাড়ভাঙা রোগের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি অধ্যাপক রোমেল সারওয়ার স্যারের নেতৃত্বে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিক টিমের সঙ্গেও যুক্ত আছি।

এই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসা ক্যাম্পে গিয়েছি, কাজ করেছি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তা বিশেষভাবে মনে দাগ কেটেছে।

এখানে প্রতিদিন আসা রোগীদের মধ্যে অনেক শিশু রোগীও থাকে। তবে জটিল পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচারগুলোর বেশিরভাগই করতে হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিংবা জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে। ফলে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

আমাদের ইউনিটে বর্তমানে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪৭০ জন। এর মধ্যে আমরা প্রায় ৭০০ জনের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে পেরেছি। বাকি রোগীরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন একটি অস্ত্রোপচারের আশায়।

এই চাপ কমানোর জন্যই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিকের জটিল অস্ত্রোপচার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আমি গেস্ট সার্জন হিসেবে সেখানে যাই। পুরো উদ্যোগটির পেছনে যিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, তিনি ডা. মোহাম্মদ আসিফ। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের এই তরুণ ও দক্ষ অর্থোপেডিক সার্জন আমাদের পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিক টিমেরও একজন সক্রিয় সদস্য।

তার আন্তরিকতা, উদ্যোগ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সেদিন কয়েকটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে অন্য একটি বিষয়।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের উষ্ণ আতিথেয়তা, রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং সীমিত সম্পদ নিয়েও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার মানসিকতা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই হাসপাতাল যেমন দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, আজও সেই চেতনা তারা ধরে রেখেছে।

আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্যখাতের ব্যর্থতা, দুর্নীতি কিংবা অব্যবস্থাপনার কথা শুনি। সেগুলো অবশ্যই আলোচনায় আসা উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সেইসব মানুষদের কথাও বলতে হবে, যারা প্রতিদিন সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

একদিকে যদি কোথাও অব্যবস্থাপনা মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, অন্যদিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে—সঠিক নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও অসাধারণ সেবা দেওয়া সম্ভব।

এই গল্পটি তাই শুধু একটি হাসপাতালের নয়।

এটি ছয়জন চিকিৎসকের গল্প।

এটি দুইটি কক্ষের গল্প।

এটি হাজারো মানুষের ভরসার গল্প।

আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি এমন এক বাংলাদেশকে দেখার গল্প—যেখানে এখনও নীরবে, প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে, কিছু মানুষ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক:
ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াৎ তাসফিন
রেজিস্ট্রার
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান