স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

শারমিন শাওন, নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পি এম

পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক যেভাবে শরীরের ক্ষতি করতে পারে

ছবি : সংগৃহীত

প্রতিদিনের পানীয় পানির সঙ্গে অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা। কলের পানি, নদী-হ্রদের পানি এবং বোতলজাত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এসব কণা শরীরে প্রবেশের পর কীভাবে বিভিন্ন অঙ্গ ও কোষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বাড়ছে। তবে মানুষের শরীরে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মাত্রা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণা। এগুলো আরও ভেঙে ন্যানোপ্লাস্টিক তৈরি করতে পারে, যা এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণ অণুবীক্ষণ পদ্ধতিতেও শনাক্ত করা কঠিন। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও অন্যান্য সামগ্রী ক্ষয় হয়ে এসব কণা তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়ায় তা পানির উৎসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বোতলজাত পানিতেও মিলছে প্লাস্টিকের কণা

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় Proceedings of the National Academy of Sciences সাময়িকীতে। এতে বোতলজাত পানির নমুনা পরীক্ষা করে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যায়। এর প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল ন্যানোপ্লাস্টিক।

গবেষণাটিতে তিনটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি পরীক্ষা করা হয়েছিল। 

শরীরে প্রবেশ করে কীভাবে ক্ষতি করতে পারে?

কোষে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। এতে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

হজমতন্ত্রের ওপর প্রভাব: পানির সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করা অনেক কণা পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে মলত্যাগের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে কণার আকার, আকৃতি ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কিছু কণা অন্ত্রের দেয়ালের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। প্রাণী ও কোষভিত্তিক গবেষণায় অন্ত্রের প্রদাহ এবং অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মানুষের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

লিভার ও বিপাকীয় কার্যক্রমে সম্ভাব্য ক্ষতি: পরীক্ষামূলক গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শের সঙ্গে লিভারের কোষে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং বিপাকীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে পানীয় পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট রোগ সৃষ্টি করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।

হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব: কিছু প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আবার প্লাস্টিকের কণার সঙ্গে পরিবেশের কিছু দূষক পদার্থও যুক্ত থাকতে পারে। এসব উপাদান ও কণার সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে।

২০২৫ সালে Nature Medicine সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। এতে কোষে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং বিভিন্ন অঙ্গের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয় উঠে আসে। 

ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়ানো কঠিন হলেও কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। নিরাপদ পানির উৎস ব্যবহার করা, পানির সংরক্ষণ ও শোধনের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিকের বোতল অতিরিক্ত গরম পরিবেশে না রাখা ভালো। পানির ফিল্টার ব্যবহার করলে সেটি কত ধরনের ও কত আকারের কণা দূর করতে পারে, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। সব ফিল্টার সমান কার্যকর নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পানীয় পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দূষণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। গবেষণায় সম্ভাব্য ক্ষতির বিভিন্ন প্রক্রিয়া চিহ্নিত হলেও মানুষের শরীরে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গুরুতর, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।