স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা:দেশে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)।
বর্তমানে মাসে দুটি করে লিভার প্রতিস্থাপন করা হলেও আগামী বছরের শেষ নাগাদ এ সংখ্যা বাড়িয়ে চারটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এতে দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি বিদেশে চিকিৎসার জন্য রোগীদের নির্ভরশীলতা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফ উদ্দিন জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়মিতভাবে লিভার প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভারের শেষ পর্যায়ের সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও গুরুতর লিভার ফেইলিউরের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। সফল প্রতিস্থাপনের পর অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান।
বিএমইউর সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রতিস্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতি। এ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে দেশে আরও বেশি রোগী চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে দেশে এ পর্যন্ত ১৩টি লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে বিএমইউতে আটটি, বারডেমে তিনটি এবং ল্যাবএইডে দুটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বিএমইউ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ২০১৯ সালে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু করে।
সর্বশেষ ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে বিনা মূল্যে করা হয়েছে। আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর আরও দুটি প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বশেষ ছয়জন রোগীর মধ্যে পাঁচজন বেঁচে আছেন এবং একজন সংক্রমণজনিত কারণে মারা গেছেন।
এর আগে প্রতিস্থাপন করা চারজন রোগীও অস্ত্রোপচারের পর ভালো আছেন বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তাঁদের হিসাবে, বিএমইউতে লিভার প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি রোগীর লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দেশে সীমিতসংখ্যক প্রতিস্থাপন হওয়ায় অনেক রোগীকে বিদেশে যেতে হয়।
বিদেশে এ অস্ত্রোপচারে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। জটিলতা দেখা দিলে ব্যয় এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে চিকিৎসা নিতে খরচ এক থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, বিএমইউতে সরকারি ভর্তুকিতে লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যয় আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে করপোরেট ব্যবস্থাপনায় এ ব্যয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হতে পারে।
প্রতিস্থাপনের সংখ্যা ও কার্যক্রম বাড়লে ভবিষ্যতে চিকিৎসার ব্যয় আরও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বিএমইউতে জীবিত দাতার লিভারের একটি অংশ নিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে অঙ্গদানের ঝুঁকি এড়াতে দাতার স্বাস্থ্য, গ্রহীতার সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়।
সাধারণত ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী সুস্থ ব্যক্তিকে সম্ভাব্য দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গুরুতর ও অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে তাঁকে দাতা হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দাতার লিভারের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ অপসারণ করা সম্ভব। অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট লিভার ধীরে ধীরে বেড়ে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরে পেতে পারে।
তবে লিভার প্রতিস্থাপনের পর গ্রহীতাকে আজীবন চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হয় এবং প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমাতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী ওষুধ গ্রহণ করতে হয়।
দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জটিল লিভার রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় ও দীর্ঘ ভ্রমণের প্রয়োজনও কমতে পারে।