স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
ঢাকা: তৃণমূল পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু করতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দ্রুত নতুন চিকিৎসক ও মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আজ রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা মাস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের মাধ্যমে যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের নারীদেরও এ কার্যক্রমের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ, সচেতনতার অভাব ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বিলম্বের কারণে অনেক নারী প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে পারেন না।
তিনি বলেন, দেশে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়ছে। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও নারীরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু সচেতনতার অভাব, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়। এতে আক্রান্ত নারীরা যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং চিকিৎসাপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্তন ক্যান্সার মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। এ জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং নারীদের মধ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চিকিৎসকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু সভা-সেমিনার আয়োজন কিংবা টেলিভিশনে প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে জনসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব নয়। এ জন্য চিকিৎসকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁদের সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে এবং রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ সম্পর্কে সরাসরি সচেতন করতে হবে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। বছরে অন্তত দুই-তিন দিন নিজের গ্রামে ফিরে যান। স্থানীয় নারীদের একত্র করে স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ এবং কীভাবে স্তন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়, তা শেখান। এটি মানবতার সেবা ও মহৎ কাজ।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, চিকিৎসকদের এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করা প্রয়োজন। তৃণমূল পর্যায়ে স্ক্রিনিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, একসময় দেশে সংক্রামক ব্যাধিতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ থেকে ৭৩ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ।
তিনি বলেন, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এসব রোগের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও জানান, দেশে প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ১৫ জনের স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হয়। আক্রান্ত নারীদের প্রায় ৬৩ শতাংশ কোনো ধরনের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আসেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়, যা পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে।
তিনি বলেন, স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্ক্রিনিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে আক্রান্ত নারীদের যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাছির উদ্দীন। এ সময় ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনসহ স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের বক্তব্যে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে স্ক্রিনিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা গেলে স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা কমানো সম্ভব হতে পারে।
সরকারের গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলের নারীদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের সুযোগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।