স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ পি এম

কৃত্রিম কিডনির স্বপ্ন পূরণে পথে বাংলাদেশের সন্তান ড. শুভ রায়

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়, তখন একজন রোগীর জীবন অনেক সময় ডায়ালাইসিসের সঙ্গে বাঁধা পড়ে যায়। সপ্তাহে একাধিকবার হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নেওয়া, নানা শারীরিক জটিলতা সামলানো এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য উপযুক্ত দাতার অপেক্ষা-সব মিলিয়ে কিডনি রোগীর জীবন হয়ে ওঠে কঠিন এক বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার বাইরে নতুন একটি চিকিৎসা-পথ তৈরির লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশের সন্তান ড. শুভ রায়।

তার গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে শরীরের ভেতরে স্থাপনযোগ্য একটি ‘বায়োআর্টিফিশিয়াল কিডনি’। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি কিডনির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ কৃত্রিমভাবে সম্পাদনে সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকো (ইউসিএসএফ)-এর অধ্যাপক হিসেবে তিনি বহু বছর ধরে এ প্রযুক্তি উন্নয়নের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

ড. শুভ রায়ের জন্ম ঢাকায়, ১৯৬৯ সালের ১০ নভেম্বর। জীবনের প্রথম অধ্যায়ের একটি অংশ বাংলাদেশে কাটানোর পর তিনি পরিবারের সঙ্গে উগান্ডা এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। শিক্ষাজীবনে তিনি মাউন্ট ইউনিয়ন কলেজে পড়াশোনা করেন।

পরে কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সে মাস্টার্স এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি মাস্টার্স এবং ২০০১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ক্যারিয়ারের শুরুতে শুভ রায় ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের বায়োমেমস ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করেন। ২০০৮ সালে তিনি ইউসিএসএফে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড থেরাপিউটিক সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক এবং বায়োডিজাইন ল্যাবরেটরির পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি ‘দ্য কিডনি প্রজেক্ট’-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘দ্য কিডনি প্রজেক্ট’-এর মূল লক্ষ্য এমন একটি ইমপ্লান্টযোগ্য বায়োআর্টিফিশিয়াল কিডনি তৈরি করা, যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর শরীরে স্থাপন করা যাবে এবং কিডনির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদনে সহায়তা করবে।

প্রকল্পটির ধারণা অনুযায়ী, এই কৃত্রিম কিডনিতে দুটি প্রধান অংশ থাকবে। প্রথমটি হলো ‘হিমোফিল্টার’। সিলিকন মেমব্রেনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছিদ্রের মাধ্যমে রক্ত থেকে বিষাক্ত ও বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে ফেলার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় অংশটি হলো ‘বায়োরিঅ্যাক্টর’। এতে কালচার করা মানব কিডনি কোষ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কোষ কিডনির এমন কিছু কার্যক্রম অনুকরণ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, যা কেবল রক্ত পরিশোধনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না।

অর্থাৎ, একদিকে প্রযুক্তির সাহায্যে রক্ত পরিশোধন এবং অন্যদিকে জীবন্ত কিডনি কোষের কার্যক্রম-এই দুই পদ্ধতিকে একত্র করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিটির ধারণা হলো, শরীরে স্থাপিত যন্ত্রটি রোগীর নিজের হৃদপিণ্ডের রক্তপ্রবাহের চাপকে কাজে লাগিয়ে রক্ত পরিশোধনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।

বর্তমানে কিডনি বিকল রোগীদের চিকিৎসায় ডায়ালাইসিস একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। অন্যদিকে কিডনি প্রতিস্থাপনও কার্যকর চিকিৎসা হলেও উপযুক্ত দাতা পাওয়া এবং প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষা করা অনেক রোগীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় ‘দ্য কিডনি প্রজেক্ট’ ডায়ালাইসিস ও প্রতিস্থাপনের বাইরে একটি সম্ভাব্য চিকিৎসা-পদ্ধতি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে।

এই গবেষণায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানোটেকনোলজি এবং কোষবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। সিলিকন মেমব্রেনের অতি সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে রক্ত থেকে নির্দিষ্ট বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে নেওয়ার পাশাপাশি জীবন্ত কিডনি কোষ ব্যবহার করে কিডনির অন্যান্য কার্যক্রম অনুকরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চিকিৎসা প্রযুক্তি ও বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অবদানের জন্য শুভ রায় বিভিন্ন স্বীকৃতিও পেয়েছেন। তাঁর অর্জনের মধ্যে রয়েছে টিআর১০০ ইয়াং ইনোভেটর হিসেবে স্বীকৃতি, নাসা গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফেলো নির্বাচিত হওয়া।

তবে বায়োআর্টিফিশিয়াল কিডনি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। এটি সাধারণ রোগীদের জন্য অনুমোদিত বা প্রচলিত চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে এই প্রযুক্তিকে বর্তমানে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

তারপরও কিডনি বিকল রোগীদের জন্য ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসা-সম্ভাবনা তৈরির ক্ষেত্রে এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা থেকে শুরু হওয়া জীবনের পথ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে শুভ রায়ের কাজ এখন এমন একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি নিয়ে, যার সঙ্গে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক কিডনি রোগীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার এই পথ এখনো দীর্ঘ। প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। সেই গবেষণারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এগিয়ে চলছে ‘দ্য কিডনি প্রজেক্ট’ এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বাংলাদেশের সন্তান ড. শুভ রায়।

তথ্যসূত্র: ইউসিএসএফ, দ্য কিডনি প্রজেক্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের প্রকাশ্য তথ্য।