স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
চট্টগ্রাম: একটি শিশুর হাসি ঘরকে কতটা আলোকিত করে, তা হয়তো সেই পরিবারই সবচেয়ে ভালো জানে। ছোট্ট পায়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো, আপন মনে খেলা করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে নানা আবদার, এসব নিয়েই গড়ে ওঠে একটি শিশুর পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীকে ঘিরেই পরিবার সাজায় ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন।
মাত্র সাত বছরের অনুশ্রীও ছিল তেমনই এক স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। ছোট্ট এই শিশুটিকে ঘিরে ছিল পরিবারের ভালোবাসা, আনন্দ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রত্যাশা।
কিন্তু সেই নিষ্পাপ জীবন থেমে গেল ডেঙ্গুর কাছে। চট্টগ্রামের এই শিশুটির চলে যাওয়ার খবর শুধু তার পরিবারকেই নয়, ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে।
অনুশ্রীর চলে যাওয়া যেন একটি পরিবারের জীবনে হঠাৎ নেমে আসা গভীর অন্ধকার। যে ঘরে হয়তো তার কণ্ঠে হাসির শব্দ শোনা যেত, যে ঘরে তাকে ঘিরে ছিল প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দ, সেই ঘরেই এখন শোকের ভার। সাত বছরের একটি শিশুর মৃত্যু যে কতটা অসহনীয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
একটি শিশুর বয়স সাত বছর। এই বয়সে জীবন মানেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার শুরু। স্কুল, বই, বন্ধু, খেলাধুলা আর নানা স্বপ্নে ভরা থাকে প্রতিটি দিন। কখনো বড় হয়ে কী হবে, কখনো নতুন কোনো খেলনা, কখনো স্কুলের গল্প, এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার পৃথিবী। কিন্তু অনুশ্রীর সেই পৃথিবী আর বড় হলো না।
ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতার কথা বলা হয় বছরের পর বছর। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করার বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারপরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সচেতনতার জায়গায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শিশুরা অনেক সময় নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা ঠিকভাবে বলতে পারে না। জ্বর বা দুর্বলতাকে তারা সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে নিতে পারে।
পরিবারের সদস্যরাও কখনো কখনো শুরুতে বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। কিন্তু ডেঙ্গুর মতো রোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই শিশুর জ্বর হলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। জ্বরের কারণ বোঝার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ানোর পরিবর্তে শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থার উপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
অনুশ্রীর মৃত্যুর ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়; এটি আমাদের চারপাশের প্রতিটি পরিবারের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ডেঙ্গু যে কোনো বয়সী মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।
মশার বিস্তার রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, টব, ফুলের পাত্র, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত দেখা দরকার।
সামান্য পরিমাণ জমে থাকা পানিও মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই শুধু নিজের ঘর পরিষ্কার রাখলেই হবে না, বাড়ির আশপাশের পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হবে।
শিশুদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করাও জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহার, ঘরে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা এবং দিনের বিভিন্ন সময়েও শিশুদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। কারণ ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সাধারণ ধারণার মতো শুধু রাতেই কামড়ায়, এমন নয়।
তবে সচেতনতার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ। শিশুর জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু জ্বরকে অবহেলাও করা যাবে না।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুশ্রীর চলে যাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শিশুর জীবন কতটা মূল্যবান। একটি পরিবারের কাছে তার প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কথা, প্রতিটি দুষ্টুমি ছিল অমূল্য।
হয়তো তার জন্য আরও অনেক জন্মদিন অপেক্ষা করছিল, স্কুলের আরও অনেক দিন ছিল, ছিল আরও অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলোর কোনোটি আর পূর্ণ হবে না।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা, শিশুকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা কিংবা জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, এমন ছোট ছোট পদক্ষেপই কখনো একটি জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ছোট্ট অনুশ্রী আর ফিরে আসবে না। তার পরিবারের শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তার চলে যাওয়ার বেদনা যদি আমাদের আরও সতর্ক করে, যদি আরেকটি শিশুকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে, তবে সেই সচেতনতাই হতে পারে তার স্মৃতির প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধা।
আজ অনুশ্রীর পরিবারের ঘরে যে কান্না, আগামী দিনে যেন আর কোনো পরিবারকে সেই কান্নায় ভেঙে পড়তে না হয়, এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।