স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ পি এম

হৃদস্পন্দন নেই, তবু জীবিত: কৃত্রিম হৃদয়ের অবিশ্বাস্য গল্প

ছবি: সংগৃহীত

একজন মানুষের বুকের ভেতর হৃদযন্ত্র আছে, অথচ তার কোনো স্পন্দন নেই, কথাটি শুনতে যতটা অবিশ্বাস্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ততটাই বাস্তব এক ঘটনা।

হৃদযন্ত্রের কাজ আমরা সাধারণত কল্পনা করি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে-সংকোচন ও প্রসারণ, অর্থাৎ স্পন্দনের মাধ্যমে রক্ত সারা শরীরে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু একদল চিকিৎসক ও প্রকৌশলী এমন একটি কৃত্রিম হৃদযন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা স্পন্দিত না হয়েও মানুষের শরীরে রক্তপ্রবাহ সচল রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

এই অভিনব প্রযুক্তির পেছনে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস হার্ট ইনস্টিটিউটের দুই সার্জন-ড. বিলি কোহেন ও ড. বাড ফ্রেজার। তাদের তৈরি কৃত্রিম হৃদযন্ত্রটি প্রচলিত কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের ধারণা থেকে ছিল বেশ আলাদা।

এতে ছিল দুটি সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প এবং ঘূর্ণায়মান রটার। এই রটার দ্রুত ঘুরে রক্তকে সামনে ঠেলে দিত। ফলে হৃদযন্ত্রের মতো বারবার সংকুচিত ও প্রসারিত হওয়ার প্রয়োজন হতো না; বরং রক্ত শরীরের ভেতর দিয়ে চলত ধারাবাহিকভাবে।

অর্থাৎ, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ‘লাব-ডাব’ শব্দের সঙ্গে যার পরিচয়, সেই হৃদযন্ত্রের পরিবর্তে এখানে কাজ করছিল এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন পাম্প।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণায় হৃদযন্ত্রের স্পন্দন শুধু একটি শব্দ বা অনুভূতি নয়; এটি রক্ত সঞ্চালনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। হৃদযন্ত্র সংকুচিত হয়ে রক্তকে ধমনিতে পাঠায় এবং পরবর্তী ধাপে আবার রক্ত গ্রহণ করে।

কিন্তু কোহেন ও ফ্রেজারের তৈরি যন্ত্রটি সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেনি। বরং তারা ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছিলেন, রক্তকে অবিরাম প্রবাহিত রাখা।

প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা বোঝার জন্য প্রথমে এটি প্রাণীর শরীরে পরীক্ষা করা হয়। ‘অ্যাবিগেইল’ নামের একটি বাছুরের শরীরে কৃত্রিম হৃদযন্ত্রটি স্থাপন করা হয়েছিল। পরীক্ষাটি চিকিৎসকদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে একটি নতুন ধরনের যন্ত্র শরীরে কীভাবে কাজ করে, রক্তপ্রবাহ বজায় রাখতে পারে কি না এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণীর জীবনধারণে সহায়তা করতে পারে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন ছিল।

প্রাণীর ওপর পরীক্ষার পর আসে আরও কঠিন ও ঐতিহাসিক ধাপ। মারাত্মক অ্যামাইলয়েডোসিসে আক্রান্ত ৫৫ বছর বয়সী ক্রেইগ লুইসের শরীরে এই কৃত্রিম হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করা হয়।

লুইসের অবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুতর। অ্যামাইলয়েডোসিস এমন একটি রোগ, যাতে শরীরের বিভিন্ন টিস্যু ও অঙ্গে অস্বাভাবিক প্রোটিনজাত পদার্থ জমা হতে পারে।

হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হলে এর কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। লুইসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে চিকিৎসকেরা প্রচলিত চিকিৎসার সীমার বাইরে গিয়ে এই পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।

তার শরীরে কৃত্রিম হৃদযন্ত্র বসানোর পর চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন, লুইসের শরীরে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে কিন্তু তার হৃদস্পন্দন নেই।

এখানেই ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য পায়।

লুইস টানা এক মাসেরও বেশি সময় এই ‘স্পন্দনহীন হৃদয়’ নিয়ে বেঁচে ছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি ছিল একটি অদ্ভুত বাস্তবতা—একজন মানুষ জীবিত, তার শরীরে রক্তপ্রবাহ চলছে, কিন্তু প্রচলিত অর্থে হৃদস্পন্দন নেই। চিকিৎসকেরা স্টেথোস্কোপ দিয়ে স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন শোনার বদলে যন্ত্রটির ধারাবাহিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত লুইসের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তিনি মারা যান তার মূল রোগ অ্যামাইলয়েডোসিসের কারণে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃত্রিম হৃদযন্ত্রটি ব্যর্থ হয়ে তার মৃত্যু ঘটায়নি। বরং যন্ত্রটি তার শরীরে রক্তপ্রবাহ বজায় রাখার কাজ করে যাচ্ছিল।

এই ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন তুলে দেয়, মানুষের শরীরে হৃদযন্ত্রের কাজ সম্পন্ন করতে কি অবশ্যই স্পন্দনের প্রয়োজন আছে?

কোহেন ও ফ্রেজারের প্রযুক্তি দেখিয়েছিল, অন্তত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক রক্তপ্রবাহের মাধ্যমেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তাদের ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউগাল পাম্পের ঘূর্ণায়মান রটার রক্তকে অবিরাম সামনে ঠেলে দিত। প্রচলিত কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের মতো বড় ধরনের যান্ত্রিক স্পন্দন তৈরি করার প্রয়োজন ছিল না।

এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ছিল আরও বিস্তৃত। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, যেহেতু এতে স্পন্দিত অংশের সংখ্যা ও যান্ত্রিক চাপের ধরন ভিন্ন, তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের কৃত্রিম হৃদযন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

একই সঙ্গে যন্ত্রটির আকার ও কার্যপ্রণালি উন্নত করা গেলে হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

তবে একটি পরীক্ষামূলক সাফল্যকে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য একটি কৃত্রিম হৃদযন্ত্রকে নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব এবং বিভিন্ন জটিলতার দিক থেকে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

রক্ত জমাট বাঁধা, সংক্রমণ, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্তসঞ্চালনের প্রভাব, সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক চিকিৎসা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনও অপরিহার্য।

ফলে লুইসের ঘটনা ছিল একই সঙ্গে একটি চিকিৎসা-সাফল্য এবং গবেষণার সীমাবদ্ধতার স্মারক।

একদিকে এটি দেখিয়েছিল, মানুষের শরীরে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক স্পন্দন ছাড়াও রক্তপ্রবাহ বজায় রাখার একটি বিকল্প পথ বাস্তবে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে লুইসের মৃত্যু মনে করিয়ে দিয়েছিল, একটি নতুন যন্ত্র সফলভাবে কাজ করলেও সেটি মূল রোগকে সবসময় পরাজিত করতে পারে না।

‘স্পন্দনহীন হৃদয়’ তাই শুধু একটি কৃত্রিম অঙ্গের গল্প নয়। এটি মানুষের শরীর, যন্ত্র এবং জীবনের সীমা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসাধারণ পরীক্ষার গল্প।

প্রকৃত হৃদযন্ত্রের মতো স্পন্দন না থাকলেও একটি যন্ত্র যে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় রক্তপ্রবাহ চালিয়ে যেতে পারে, এই ধারণাই একসময় চিকিৎসকদের প্রচলিত চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

আজ হৃদযন্ত্রের বিকল্প প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা আরও এগিয়েছে। কিন্তু ক্রেইগ লুইসের সেই এক মাসেরও বেশি সময়ের জীবন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।

তার শরীরে চলা সেই নীরব পাম্প যেন একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, হৃদযন্ত্র কি সত্যিই স্পন্দনের সমার্থক, নাকি জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু রক্তের অবিরাম প্রবাহ?

সম্ভবত ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান সেই প্রশ্নের আরও পরিপূর্ণ উত্তর দেবে। আর সেই ভবিষ্যতের পথে ‘স্পন্দনহীন হৃদয়’ ছিল একটি সাহসী, অভূতপূর্ব পদক্ষেপ।