স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
প্রকৃতিতে জন্মানো প্রতিটি উদ্ভিদই কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকারে আসে। মাঠ-ঘাট, সড়কের পাশ কিংবা স্যাঁতসেঁতে পতিত জমিতে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো এমনই একটি উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ হলো ‘উষনি’ শাক। একসময় গ্রামীণ জনপদে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত হলেও সচেতনতার অভাব, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব এবং ভেষজ চিকিৎসার প্রতি অনীহার কারণে বর্তমানে এই মূল্যবান উদ্ভিদটি ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় উষনি শাকের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেলেও এখন তা অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও এ শাক নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকলেও বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এর নাম পর্যন্ত জানে না।
উদ্ভিদবিদদের তথ্যমতে, উষনি শাক গুল্মজাতীয় অ্যাস্টারেসি পরিবারের একটি ভেষজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Acmella oleracea। ‘ইলেকট্রিক প্ল্যান্ট’ নামেও পরিচিত এই বর্ষজীবী উদ্ভিদটি বাড়ির আশপাশ, ক্ষেতের আল, জলাশয়ের পাড়, সড়কের ধারে ও পতিত জমিতে স্বাভাবিকভাবে জন্মে থাকে। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন স্থানীয় নামও রয়েছে।
ভেষজ চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, উষনি শাকে রয়েছে অসংখ্য পুষ্টিগুণ ও ঔষধি উপাদান। এটি প্রদাহনাশক ও মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করতে সহায়তা করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, জ্বর-সর্দি-কাশি, দাঁতের ব্যথা, শরীরের ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এর উপকারিতা রয়েছে বলে জানা যায়।
এছাড়া শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, মাথাব্যথা এবং রক্ত পরিশোধনেও এটি সহায়ক বলে মনে করা হয়। ভেষজ চিকিৎসায় এর ফুল ও পাতা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে প্রসব-পরবর্তী মায়েদের শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে গ্রামাঞ্চলে এই শাক রান্না করে খাওয়ানোর প্রচলন ছিল।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও উষনি শাক বেশ সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, সোডিয়াম, বিভিন্ন ফ্যাটি অ্যাসিড, উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দীর্ঘভূমি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, “ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের মা-চাচিরা উষনি শাক কুড়িয়ে এনে রান্না করতেন। শরীর ব্যথা, সর্দি-জ্বরসহ নানা অসুস্থতায় এটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। তখন আধুনিক চিকিৎসা সহজলভ্য ছিল না, তাই মানুষ ভেষজ উদ্ভিদের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করত। এখন এই শাক আগের মতো আর দেখা যায় না।”
শিদলাই ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই উষনি শাক চেনে না। একসময় প্রসবের পর নারীদের শক্তি ফিরিয়ে আনতে এই শাক রান্না করে খাওয়ানো হতো। বিভিন্ন রোগে এর ফুলও ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন এর উপস্থিতি অনেক কমে গেছে।”
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) ডা. সোহেল রানা বলেন, “উষনি শাক প্রকৃতির এক মূল্যবান ভেষজ সম্পদ। এতে প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক উপাদান রয়েছে, যা বাত-ব্যথা ও বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এটি হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতেও সহায়ক। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যেকোনো ভেষজ উদ্ভিদ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষ বর্তমানে কৃত্রিম ওষুধের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় অনেক মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ অবহেলিত হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এসব উপকারী উদ্ভিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতির এই সম্পদ সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, উষনি শাকের মতো উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাও টিকে থাকবে।