স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৫ পি এম

ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি, লিভার সুরক্ষায় চিনি গুড়া!

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আগাছা হিসেবে পরিচিত হলেও চিনি গুড়া (Scoparia dulcis) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ। বহু শতাব্দী ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার চলে আসছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও গাছটির নানা ঔষধিগুণের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব সম্ভাবনা এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ; মানুষের ওপর আরও বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

Scoparia dulcis স্ক্রোফুলারিয়াসি (Scrophulariaceae) বা সাম্প্রতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী প্ল্যান্টাজিনেসি (Plantaginaceae) পরিবারের একটি বর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ। এটি বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া ও অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে জন্মে। এর ছোট করাতের দাঁতের মতো কিনারাযুক্ত পাতা ও সাদা ফুল সহজেই একে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে ফ্ল্যাভোনয়েড, ডিটারপিন, ট্রাইটারপিন, অ্যালকালয়েড, ফেনলিক যৌগ এবং স্কোপারিক অ্যাসিড, গ্লুটিনল, অ্যাপিজেনিন, লুটিওলিনসহ প্রায় ১৬০টির বেশি জৈব সক্রিয় উপাদান শনাক্ত হয়েছে। এসব উপাদান প্রদাহ কমানো, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা এবং বিপাকীয় রোগের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে Scoparia dulcis নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গাছটির নির্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে, ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়াতে এবং α-glucosidase এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। শ্রীলঙ্কায় পরিচালিত একটি ছোট আকারের মানব গবেষণাতেও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এটিকে ডায়াবেটিসের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও নেই।

লোকজ চিকিৎসায় ত্বকের ক্ষত, কাটা-ছেঁড়া, ফোড়া ও চুলকানিতে চিনিগুড়া পাতা বেটে লাগানোর প্রচলন রয়েছে। ভেষজ চিকিৎসকদের দাবি, এর জীবাণুরোধী ও প্রদাহনাশক বৈশিষ্ট্য ক্ষত দ্রুত শুকাতে সহায়তা করতে পারে। তবে গভীর ক্ষত, সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের রোগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, উদ্ভিদটির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক বৈশিষ্ট্য লিভারকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা চলছে।

লোকজ চিকিৎসায় Scoparia dulcis দীর্ঘদিন ধরে জ্বর, সর্দি-কাশি, বদহজম, ডায়রিয়া, ত্বকের ক্ষত, আলসার, কিডনির পাথর এবং প্রস্রাবজনিত সমস্যায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন গবেষণায় এর জীবাণুরোধী, ব্যথানাশক, আলসার প্রতিরোধী, কফ নিরসনকারী এবং লিভার সুরক্ষাকারী কার্যকারিতার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যাঁরা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ সেবন করছেন, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া Scoparia dulcis ব্যবহার করবেন না। কারণ ভেষজ উপাদান ও প্রচলিত ওষুধের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা ও শিশুদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে আরও উচ্চমানের ক্লিনিক্যাল গবেষণা পরিচালিত হলে Scoparia dulcis ভবিষ্যতে নতুন প্রাকৃতিক ওষুধ উদ্ভাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত এটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভাবনাময় ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়।