স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

জামাল হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি
  ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৪ পি এম

চিকিৎসক বাড়ছে, নার্সে কেন এতো ঘাটতি?

ছবি: প্রতীকী

ঢাকা: দেশে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা অবকাঠামো বাড়লেও সেই তুলনায় নার্সিং জনবল এখনো বড় ঘাটতিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ১:৩ চিকিৎসক-নার্স অনুপাত বিবেচনায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের বিপরীতে প্রয়োজন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৭ জন নার্স।

কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফ মিলিয়ে জনবল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৩ জনের মতো। এই হিসাবকে একই ভিত্তিতে তুলনা করলে প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১১৪ জন।

তবে নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা আর সরকারি হাসপাতালে কর্মরত নার্সের সংখ্যা এক নয়। ফলে ১ লাখ ১৩ হাজার ১১৪ জনকে সরাসরি সরকারি চাকরির শূন্য পদ বলা যাবে না।

বরং এটি ১:৩ অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা এবং দেশে নিবন্ধিত নার্স-মিডওয়াইফের সংখ্যার মধ্যে একটি হিসাবি ব্যবধান। বাস্তবে সরকারি খাতে শূন্য পদের সংখ্যাও যথেষ্ট বড়, যা সংকটের আরেকটি মাত্রা তুলে ধরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের সংখ্যা ৮৮ হাজার ৯০৯ জন। একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্সের অনুপাত ধরলে মোট নার্সের প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৭ জন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশে নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৩ জন উল্লেখ করা হয়েছে।

একই গবেষণায় বাংলাদেশের নার্স-চিকিৎসক অনুপাত প্রায় ১.১:১, যা ৩:১ অনুপাতের তুলনায় অনেক কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৭ জনের বিপরীতে নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফ ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৩ জন ধরলে ব্যবধান দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১১৪ জন।

অর্থাৎ ১:৩ অনুপাতের কাছাকাছি যেতে হলে বর্তমান নিবন্ধিত জনবলের তুলনায় আরও প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার জন প্রয়োজন।

তবে এই হিসাবের সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের বাস্তব জনবল পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে। নিবন্ধিত সব নার্স সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন না।

কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, কেউ বিদেশে কর্মরত এবং কেউ বিভিন্ন কারণে পেশায় সক্রিয় নাও থাকতে পারেন।

ফলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত নার্স সংকট নিরূপণে অনুমোদিত পদ, কর্মরত জনবল ও শূন্য পদের হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে নার্সিংয়ের অনুমোদিত পদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

চলতি বছরের জুনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ৪৯ হাজার ৫০১টি নার্সিং পদের মধ্যে ৫ হাজার ৩২টি পদ শূন্য ছিল।

একই সময়ে চিকিৎসকদের ৪১ হাজার ৮০৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৯ হাজার ৪০৭টি পদ শূন্য ছিল।

পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ে সংসদে দেওয়া আরেক তথ্যে নার্সদের জন্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৮৭৯ এবং কর্মরত নার্সের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৩০২ জন বলে জানানো হয়। অর্থাৎ তখনও ৪ হাজার ৫৭৭টি নার্সিং পদ শূন্য ছিল।

এসব পরিসংখ্যান থেকে সরকারি হাসপাতালে বিদ্যমান শূন্য পদের চিত্র পাওয়া গেলেও সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি অনুমোদিত পদই যথেষ্ট কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত আন্তর্জাতিক নার্সেস ডে উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে অন্তত তিনজন নার্স প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময় দায়িত্ব পালন করলেও নার্সকে রোগীর পাশে ২৪ ঘণ্টা থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই অনুপাতে নার্স নেই। ফলে বিদ্যমান নার্সদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ তৈরি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বাংলাদেশের নার্সিং জনবলের এই ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশে নার্স ও মিডওয়াইফের ঘনত্ব এবং চিকিৎসকের তুলনায় নার্সের সংখ্যা, দুটিই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেশে নার্স ও মিডওয়াইফের ঘনত্ব প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় ৬ দশমিক ৬ জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নার্সের ঘাটতি কেবল জনবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রোগীর সেবায়। হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগীর দায়িত্ব যখন একজন নার্স বা সীমিতসংখ্যক নার্সের ওপর পড়ে, তখন প্রতিটি রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ওষুধ প্রয়োগ, রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং রোগীর স্বজনদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।

অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চিকিৎসক ও নার্স উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ পড়ে। তবে রোগীর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে থাকার কারণে নার্সদের ওপর এই চাপের প্রভাব আরও সরাসরি পড়ে।

বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষায় গত কয়েক বছরে সম্প্রসারণ ঘটলেও প্রশিক্ষিত জনবলকে পর্যাপ্তসংখ্যায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা যায়নি। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল নিয়মিত নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফের তথ্য হালনাগাদ করছে।

২০২৬ সালেও কাউন্সিলের তথ্যভান্ডারে নিবন্ধিত জনবলের সংখ্যা নিয়মিতভাবে আপডেট করা হয়েছে। কিন্তু নিবন্ধিত জনবল এবং সক্রিয় কর্মরত জনবলের মধ্যে পার্থক্য থাকায় শুধু নিবন্ধনের সংখ্যা দিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নার্সের প্রকৃত প্রাপ্যতা নির্ধারণ করা যায় না।

নার্সিং জনবল সংকট মোকাবিলায় নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১৫ হাজার নতুন নার্সিং পদ সৃষ্টির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পাশাপাশি মিডওয়াইফারির নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতে নার্সের সংখ্যা বাড়বে এবং বিদ্যমান জনবল সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে নার্সিং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল, জনবল সংকট মোকাবিলায় কয়েক হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে সব শূন্য পদ পূরণ করা সম্ভব নয়; ধাপে ধাপে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই নার্স সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ বর্তমান অনুমোদিত পদ এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা এক নয়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার নতুন নতুন ক্ষেত্র যুক্ত হওয়ার সঙ্গে নার্সের প্রয়োজনও বাড়ছে।

তাই স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন হাসপাতালে কতজন রোগী, কতটি শয্যা, কী ধরনের চিকিৎসা এবং কী ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে, এসব বিবেচনা করে নার্সের প্রয়োজনীয় সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত নার্সের প্রয়োজনীয়তা আলাদাভাবে নিরূপণ করা দরকার।

শুধু সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। নার্সিং শিক্ষার মান, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত নার্সিং শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, আবাসন, পদোন্নতি, কাজের পরিবেশ এবং যথাযথ কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

 দক্ষ নার্সদের একটি অংশ বিদেশে চলে যাওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেটিও জনবল পরিকল্পনায় বিবেচনায় নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসক ও নার্সকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করলেও রোগীর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের বড় দায়িত্ব নার্সের।

ফলে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি একই গতিতে নার্সের সংখ্যাও বাড়ানো না হলে স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করা কঠিন।

৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের বিপরীতে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৭ জন নার্স প্রয়োজন, এই হিসাব বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক ও নার্সের মধ্যে বিদ্যমান জনবল ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। নিবন্ধিত নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা দিয়ে হিসাব করলে প্রয়োজনীয়তার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১১৪ জন।

তবে এই সংখ্যাকে সরকারি খাতের সরাসরি শূন্য পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারি খাতের প্রকৃত ঘাটতি জানতে হলে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত নার্স, অনুমোদিত পদ এবং শূন্য পদের পৃথক হিসাব প্রয়োজন।

কিন্তু সামগ্রিক চিত্রটি স্পষ্ট, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং এই ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক জনবল পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।