স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং
মৃত্যুর সঙ্গে যখন প্রতিটি নিঃশ্বাসের লড়াই, তখন একটি ভেন্টিলেটরই হয়ে ওঠে জীবন আর মৃত্যুর মাঝের শেষ ভরসা। কিন্তু উন্নতমানের মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের উচ্চমূল্য এবং সীমিত প্রাপ্যতার কারণে বাংলাদেশের বহু হাসপাতাল, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এখনো এই জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেই দীর্ঘদিনের বাস্তবতায় আশার নতুন আলো দেখাচ্ছে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর ‘VENTUS’।
সম্প্রতি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে যন্ত্রটির প্রথম প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একজন রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসে কার্যকর সহায়তা দিয়ে ‘VENTUS’ শুধু একটি যন্ত্রের সক্ষমতাই নয়, বাংলাদেশের চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
আজকের এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণা, অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের নিবিড় পরিশ্রম।
উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. আসিফ উর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কার্ডিওলজির পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি ডা. সিফায়েত ইনাম স্বাক্ষর এবং প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক বায়েজিদ শুভ। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রকৌশল-দুই ভিন্ন ক্ষেত্রের এই সমন্বয়ই ‘VENTUS’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
রোগীর বৈধ অভিভাবকের লিখিত সম্মতি নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে আইসিইউতে ট্রায়াল পরিচালিত হয়।
পরীক্ষার পুরো সময় রোগীর,
সব গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় সূচক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ট্রায়াল শেষে আর্টেরিয়াল ব্লাড গ্যাস (ABG) পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অক্সিজেনেশন ও ভেন্টিলেশনের কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা হয়।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ‘VENTUS’ প্রত্যাশিতভাবে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসে কার্যকর সহায়তা দিতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ উন্নতমানের ভেন্টিলেটর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব যন্ত্রের দাম কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে অনেক সরকারি হাসপাতালেও প্রয়োজনের তুলনায় ভেন্টিলেটরের সংখ্যা কম।
যদি ‘VENTUS’ প্রয়োজনীয় সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও সরকারি অনুমোদন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে স্বল্প খরচে দেশেই উন্নতমানের ভেন্টিলেটর উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে
উদ্ভাবক দলের অন্যতম সদস্য ডা. আসিফ উর রহমানের কণ্ঠে ছিল দায়িত্ববোধ আর প্রত্যয়ের সুর।
তিনি বলেন,
“আমাদের মূল লক্ষ্য হলো স্বল্প খরচে দেশের প্রতিটি সংকটাপন্ন রোগীর কাছে ভেন্টিলেটর সেবা পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণা, পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মহান আল্লাহর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেলে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও অনুমোদনের মাধ্যমে ‘VENTUS’কে দেশের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত করতে চাই।”
এই বক্তব্য শুধু একজন উদ্ভাবকের অনুভূতি নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আত্মনির্ভরশীল করার এক প্রত্যয়ের ঘোষণাও বটে।
সফল প্রাথমিক ট্রায়াল নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে এখানেই শেষ নয়।
উদ্ভাবক দলের মতে, এখনো আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা মূল্যায়ন, প্রযুক্তিগত মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন। এসব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই ‘VENTUS’ নিয়মিত চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে শিখিয়েছে, ভেন্টিলেটর শুধু একটি চিকিৎসা যন্ত্র নয়; এটি জাতীয় স্বাস্থ্যনিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই দেশীয় প্রযুক্তিতে এমন একটি জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের সফল উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, এটি স্বাস্থ্যখাতে আত্মনির্ভরতারও প্রতীক।
বাংলাদেশের চিকিৎসক, গবেষক ও প্রকৌশলীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেখিয়ে দিয়েছে-সুযোগ, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে দেশীয় উদ্ভাবনও বিশ্বমানের চিকিৎসা প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম।
‘VENTUS’-এর যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। বরং সফল প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সামনে রয়েছে আরও পরীক্ষা, আরও মূল্যায়ন, আরও চ্যালেঞ্জ। তবে যদি সব ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করা যায়, তাহলে হয়তো খুব বেশি দিন নয়—বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে সংকটাপন্ন রোগীর জীবন বাঁচাতে দেশেই তৈরি একটি ভেন্টিলেটর নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠবে।
সেই দিনের অপেক্ষায় এখন চিকিৎসক সমাজ, গবেষক এবং পুরো দেশ।