স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পি এম

মায়ের গর্ভেই অনাগত শিশুকে বাঁচিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ঐতিহাসিক সাফল্য!

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর আলো দেখার আগেই যেন থমকে যেতে বসেছিল একটি ছোট্ট প্রাণের যাত্রা। মায়ের গর্ভেই সে লড়ছিল তীব্র রক্তস্বল্পতার সঙ্গে। পরিবার অপেক্ষায় ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের, আর মা প্রতিটি মুহূর্ত পার করছিলেন অজানা শঙ্কায়। সেই কঠিন সময়ে একদল চিকিৎসকের দক্ষতা, সাহস এবং মানবিক প্রচেষ্টায় বদলে গেল গল্পের শেষটা। গর্ভের শিশুর শরীরে সফলভাবে রক্ত সঞ্চালন করে তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার সুযোগ দিলেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

দেশের সরকারি হাসপাতালের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো গর্ভের শিশুর শরীরে সফলভাবে রক্ত সঞ্চালনের (ইনট্রাউটেরাইন ব্লাড ট্রান্সফিউশন) মাধ্যমে এমন একটি জটিল চিকিৎসা সম্পন্ন হলো। গত ১ জুলাই প্রসূতি ও মাতৃ-ভ্রূণ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. খন্দকার শেহনীলা তাসমিনের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ এই চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেক সময় মায়ের ও গর্ভস্থ শিশুর রক্তের গ্রুপের অমিল, বিশেষ করে Rh incompatibility, অথবা অন্য কোনো জটিল কারণে গর্ভের শিশুর শরীরে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। চিকিৎসা না পেলে শিশুটি জন্মের আগেই মারা যেতে পারে। এমন সংকটময় অবস্থায় আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর নাভির রক্তনালিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। সময়মতো এই চিকিৎসা দিতে পারলে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমে যায় এবং তাকে আরও কিছুদিন নিরাপদে মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়।

এই চিকিৎসা কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি একজন মায়ের বুকভরা দুশ্চিন্তার মধ্যে আশার আলো জ্বালানোর গল্প। যে মা প্রতিটি মুহূর্ত সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে চিকিৎসকদের এই সাফল্য হয়ে উঠেছে এক অনন্য মাইলফলক।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অর্জনের ফলে ভবিষ্যতে সরকারি হাসপাতালেই গর্ভস্থ শিশুর জটিল রোগের উন্নত চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে। একই সঙ্গে জন্মের আগেই বিভিন্ন রোগ শনাক্তকরণ এবং বিশেষায়িত মাতৃ-ভ্রূণ চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের চিকিৎসা নিয়মিত হলেও বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালে এর সফল বাস্তবায়ন দেশের মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। এটি শুধু একটি চিকিৎসা পদ্ধতির সফল প্রয়োগ নয়; এটি প্রমাণ করল, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রযুক্তি ও আন্তরিকতা থাকলে দেশের সরকারি হাসপাতালেও বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব।

একটি শিশুর প্রথম কান্না শোনার আগেই তার জীবন রক্ষার এই লড়াই তাই শুধু একটি চিকিৎসা-সংবাদ নয়; এটি এক মায়ের অশ্রু, এক পরিবারের প্রার্থনা এবং চিকিৎসকদের মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য মিলনগাঁথা। এই সাফল্য ভবিষ্যতে এমন আরও অসংখ্য পরিবারের কাছে নতুন আশা হয়ে পৌঁছাবে—যেখানে অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য আর সীমান্ত পেরোনোর প্রয়োজন হবে না, দেশের সরকারি হাসপাতালেই মিলবে উন্নত ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা।