স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

ডেস্ক প্রতিবেদক
  ৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৩০ এএম

অস্টিওপোরোসিস: নীরব ঘাতক হাড় ক্ষয় রোগ!

ছবি: সংগৃহীত

অনেকেই মনে করেন, হাড় ভাঙা বা হাড় ক্ষয় শুধুই বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী অনেক নারী-পুরুষও অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই রোগটি দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ভেতরে হাড়কে দুর্বল করে তোলে। ফলে সামান্য পড়ে যাওয়া, হাঁচি-কাশি, এমনকি স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজের সময়ও হাড় ভেঙে যেতে পারে।

সম্প্রতি একাধিক অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ জানান, হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা দীর্ঘদিন কোমর বা পিঠের হালকা ব্যথাকে গুরুত্ব দেননি। পরে হঠাৎ পড়ে গিয়ে হিপ, মেরুদণ্ড বা কব্জির হাড় ভেঙে যাওয়ার পর পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে তাদের হাড়ের ঘনত্ব (Bone Mineral Density-BMD) অনেক আগেই কমে গিয়েছিল।

কেন অস্টিওপোরোসিসকে ‘সাইলেন্ট ডিজিজ’ বলা হয়?

অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যেখানে ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং হাড়ের ভেতরের কাঠামো ফাঁপা হয়ে পড়ে। শুরুতে রোগী সাধারণত কোনো তীব্র ব্যথা অনুভব করেন না। কিন্তু হাড় দুর্বল হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সামান্য আঘাতেও বড় ধরনের ফ্র্যাকচার হতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষায়, মানুষের শরীর ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত হাড়ে ক্যালসিয়াম ও খনিজ পদার্থ জমা করে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এই সময় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব থাকলে হাড় ক্ষয়ের গতি আরও বেড়ে যায়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি অভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার কারণে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যেমন—

  • দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে থাকা এবং পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়া।
  • খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের ঘাটতি।
  • অতিরিক্ত কোমল পানীয়, চা বা কফি পান।
  • ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান।
  • নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম না করা।
  • মেনোপজ-পরবর্তী নারীরা।
  • দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন।
  • ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি।
  • পরিবারে অস্টিওপোরোসিসের ইতিহাস থাকা।

যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়

অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন লক্ষণ না থাকলেও কিছু পরিবর্তন সতর্কবার্তা হতে পারে।

  • আগের তুলনায় উচ্চতা কমে যাওয়া।
  • দীর্ঘদিনের কোমর বা পিঠের ব্যথা।
  • শরীর কুঁজো হয়ে আসা।
  • সামান্য আঘাতে বা পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়া।
  • বয়সের তুলনায় হাড়ের অস্বাভাবিক দুর্বলতা।

তবে শুধু নখ ভেঙে যাওয়া বা চুল পড়া দিয়ে অস্টিওপোরোসিস নির্ণয় করা যায় না। এগুলোর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তাই এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা

অস্টিওপোরোসিস নির্ণয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো Bone Mineral Density (BMD) Test, যা DEXA Scan নামেও পরিচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য রক্ত পরীক্ষাও করা হতে পারে।

সাধারণভাবে যাদের বয়স বেশি, মেনোপজ হয়েছে, পূর্বে হাড় ভেঙেছে বা ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে এই পরীক্ষা করানো হয়। সবার জন্য ৩০ বছর পার হলেই নিয়মিত BMD টেস্ট করানো বাধ্যতামূলক নয়।

হাড় ভালো রাখতে কী করবেন?

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন অত্যন্ত কার্যকর।

  • প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা বা ওজন বহনকারী ব্যায়াম করুন।
  • নিরাপদ সময় ও মাত্রায় সূর্যের আলো গ্রহণ করুন, যাতে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হয়।
  • খাদ্যতালিকায় দুধ, দই, ছোট মাছ, ডিম, শাকসবজি ও অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
  • কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কমান।
  • ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অর্থোপেডিক ও এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্টিওপোরোসিস ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওষুধ, পুষ্টিকর খাদ্য, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, হাড়ের ঘনত্ব, ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর।

তাদের মতে, হাড় ভেঙে যাওয়ার পর চিকিৎসা শুরু করার চেয়ে আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত করা অনেক বেশি কার্যকর। বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

বাংলাদেশে অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে সচেতনতা এখনও তুলনামূলক কম। অনেকেই দীর্ঘদিন কোমর বা পিঠের ব্যথাকে বয়সজনিত সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। অথচ সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করালে এই নীরব ঘাতকের কারণে হাড় ভাঙার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হাড় সুস্থ থাকলে শুধু চলাফেরা নয়, বার্ধক্যেও স্বাধীন ও কর্মক্ষম জীবনযাপন সম্ভব। তাই নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়াই হতে পারে ভবিষ্যতের বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।