স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৪ পি এম

বাংলাদেশি রোগী ধরে রাখতে কলকাতার হাসপাতালগুলোর নতুন কৌশল

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশি রোগীদের কলকাতামুখী চিকিৎসা যাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এবার সরাসরি বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতার কয়েকটি হাসপাতাল।

রোগী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি রোগীদের আস্থা ধরে রাখতে চায় হাসপাতালগুলো।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বাংলাদেশি রোগীদের আবাসনসংক্রান্ত সমস্যা কমাতে কলকাতার বেশ কয়েকটি হাসপাতাল নিজেদের আশপাশের হোটেল ও লজের সঙ্গে চুক্তি করছে। কেউ কেউ আবার হাসপাতালের কাছাকাছি নিজস্ব আবাসন তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে।

মূলত কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি গেস্টহাউসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের আবাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ওই অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়, যাঁদের সাতজনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। ঘটনার পর কলকাতার কম খরচের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতায় ভ্রমণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদ ও বৈধ অনুমোদন থাকা হোটেলে আগেই কক্ষ বুক করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। ভ্রমণের আগেই আবাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই সতর্কবার্তার কারণে কলকাতায় চিকিৎসা নিতে আসা বাংলাদেশি রোগীদের একটি অংশ আবাসন নিয়ে বাড়তি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন।

বিশেষ করে যাঁরা সড়কপথে কলকাতায় গিয়ে তুলনামূলক কম খরচের আবাসন খোঁজেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ ও অনুমোদিত হোটেল খুঁজে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে রোগীদের কলকাতায় আসার সিদ্ধান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে হাসপাতালগুলো।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কলকাতার বিপি পোদ্দার হাসপাতাল বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি রোগী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা এবং আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য হাসপাতালের কাছেই নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিপি পোদ্দার হাসপাতালের গ্রুপ উপদেষ্টা সুপ্রিয় চক্রবর্তী বলেন, রোগীদের চিকিৎসার যাত্রা আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে হাসপাতালের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রোগীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ এসব আবাসন খুব শিগগির চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশি রোগীদের জন্য আলিপুর এলাকায় একাধিক গেস্টহাউস ও হোটেলের সঙ্গে চুক্তি করেছে উডল্যান্ডস মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালও। হাসপাতালটির পক্ষ থেকেও আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উডল্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হসপিটালস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার (এএইচইআই) সভাপতি রূপক বড়ুয়া বলেন, নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশি রোগীদের সচেতন করা হবে।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালে আসবেন এমন রোগীদের আলিপুর এলাকার গেস্টহাউস ও হোটেলগুলোর একটি তালিকাও দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা কলকাতায় যাওয়ার আগেই কক্ষ বুক করতে পারেন।

বাংলাদেশি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে রুবি জেনারেল হাসপাতালও। এর আগে রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে প্রতিনিধি দল পাঠানো হাসপাতালটি এবার তাঁদের সহযোগিতায় একটি বিশেষ ডেস্ক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

রুবি জেনারেল হাসপাতালের প্রধান মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) সুভাষিস দত্ত বলেন, তাঁরা ইতোমধ্যে রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। হাসপাতালের কাছাকাছি নিরাপদ আবাসনগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ভ্রমণের আগে রোগীরা যাতে কক্ষ বুক করতে পারেন, সে ক্ষেত্রেও হাসপাতাল সহযোগিতা করছে।

বিদেশি রোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে ডিসান হাসপাতালের আন্তর্জাতিক সেলও। হাসপাতালটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সজল দত্ত বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শের ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সতর্কতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।

তিনি বলেন, রোগীরা কলকাতায় আসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে দেশে ফেরা পর্যন্ত নিরাপদ, সুবিধাজনক ও নির্বিঘ্ন অভিজ্ঞতা পান, সেটিই তাঁদের লক্ষ্য। রোগীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশি রোগীরা দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার হাসপাতালগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি রোগী গোষ্ঠী। চিকিৎসার তুলনামূলক কম খরচ, বাংলাদেশের সঙ্গে কলকাতার ভৌগোলিক নৈকট্য এবং সড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য সেখানে যান।

ফলে বাংলাদেশি রোগীদের আস্থা ধরে রাখা কলকাতার হাসপাতালগুলোর জন্য শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড় একটি আন্তর্জাতিক রোগী বাজার। আবাসন নিয়ে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্বেগের পর হাসপাতালগুলোর সরাসরি বাংলাদেশে প্রতিনিধি পাঠানোর উদ্যোগ সেই গুরুত্বেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এখন হাসপাতালগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশি রোগীদের নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও সার্বিক সেবা সম্পর্কে আস্থা তৈরি করা। নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কতটা দূর করা যায় এবং বাংলাদেশি রোগীদের কলকাতামুখী চিকিৎসা যাত্রা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।