স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

ডেস্ক, সম্পাদকীয় বিভাগ
  ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ পি এম

হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের ঘাটতি পূরণই হোক অগ্রাধিকার

ছবি: প্রতীকী

হাম নিয়ন্ত্রণে দেশে বারবার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নিতে হচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণ যখন দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে এবং আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে, তখন বিষয়টিকে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচির বাস্তব সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে যুক্ত।

সরকার আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের লক্ষ্য আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়ে যাওয়া প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা। উদ্যোগটি সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, আগের কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি থাকার পরও এত বিপুলসংখ্যক শিশু কীভাবে টিকার বাইরে রয়ে গেল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য শুধু কত লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য হলো, যে শিশুর টিকা পাওয়ার কথা, সে বাস্তবে টিকা পেয়েছে কি না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা, বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম প্রধান সূচক।

চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছিল। এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলা সেই কর্মসূচি পরে দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা হয়।

সরকারি হিসাবে, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যের বিপরীতে ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছিল। কিন্তু সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এখন আবার নতুন কর্মসূচি নিতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৮৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন এবং একই সময়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দেয়। প্রতিদিন এতসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হলো সংক্রমণের শৃঙ্খল এখনো পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় নতুন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা। শুধু টিকাদান কেন্দ্র খুলে বসে থাকলে চলবে না। যেসব শিশু আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

কেন তারা টিকা পায়নি, পরিবারের অনীহা, তথ্যের অভাব, টিকাদান কেন্দ্রের দূরত্ব, স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা নাকি অন্য কোনো কারণে—তা চিহ্নিত করতে হবে। কারণ সমস্যার কারণ না জেনে শুধু নতুন কর্মসূচি চালু করলে একই ঘাটতি আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। বিশেষ করে টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে এর বিস্তার দ্রুত ঘটতে পারে। ফলে একটি এলাকার টিকাদানের সামান্য ঘাটতিও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে টিকাদানকে কেবল ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়।

এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব। কোনো গুজব, ভুল তথ্য বা অমূলক আশঙ্কার কারণে শিশুকে টিকা থেকে দূরে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব হলো টিকা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা এবং সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া।

তবে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও নিজের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা খুঁজে দেখতে হবে। সরকারি পরিসংখ্যানে যদি টিকাদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়, অথচ বাস্তবে প্রায় ৩০ লাখ শিশু বাদ পড়ে থাকে, তাহলে হিসাব পদ্ধতি, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার মধ্যে কোথাও সমস্যা আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। টিকাদানের সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে বাস্তব কভারেজের নির্ভুলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা মনে করি, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে আগের কর্মসূচির পুনরাবৃত্তি হিসেবে না দেখে একটি সংশোধিত ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে পরিচালনা করা উচিত। কোন এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি বেশি, কোন জনগোষ্ঠীর শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে এবং কোথায় সংক্রমণ বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কর্মসূচির অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

পাশাপাশি হামের সংক্রমণ নজরদারি আরও জোরদার করা দরকার। নতুন আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, আক্রান্ত এলাকার তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা এবং সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। টিকাদান ও রোগ নজরদারি, এই দুই ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই—এমনটাই নতুন কর্মসূচির সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট। এখন প্রয়োজন সেই সদিচ্ছাকে কার্যকর মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় রূপ দেওয়া। একটি শিশুও যেন কেবল তথ্যের ঘাটতি, টিকাদান কেন্দ্রের দূরত্ব কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে টিকা থেকে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার নতুন উদ্যোগ তাই একটি বড় সুযোগ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু বর্তমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি যাতে বারবার তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

হাম প্রতিরোধযোগ্য, তাই প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু দুঃখজনক নয়, একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারও প্রশ্ন তোলে।

এখন সময় সংখ্যার সাফল্য দেখানোর চেয়ে প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার। হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন টিকাদান কর্মসূচি সফল হোক, টিকার বাইরে থাকা প্রতিটি শিশু সুরক্ষার আওতায় আসুক, এটাই হওয়া উচিত এখন দেশের সর্বোচ্চ জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার।