স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

ডেস্ক প্রতিবেদক
  ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১০:০৮ পি এম

‘সোনালী ব্যাগ’ কেন এখনো সোনার হরিণ?

ছবি: সংগৃহীত

পলিথিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব আমরা সবাই জানি, কিন্তু ব্যবহার কমাতে পারছি না। বাজারের ব্যাগ থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য, পোশাক, ওষুধ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী-প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার।

অথচ এই পলিথিনই আমাদের নদী-খাল, জলাশয়, কৃষিজমি ও নগরজীবনের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলাবদ্ধতা, জলদূষণ, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খানের পাট থেকে তৈরি ‘সোনালী ব্যাগ’ নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক উদ্ভাবন। দীর্ঘ গবেষণার পর ২০১৬ সালে উদ্ভাবিত এই ব্যাগকে পলিথিনের পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি হওয়ায় এটি প্রচলিত পলিথিনের তুলনায় পরিবেশে সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। সবচেয়ে বড় কথা, এর কাঁচামাল আমাদের দেশেই উৎপাদিত হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত সম্ভাবনাময় একটি উদ্ভাবন আজও কেন সাধারণ মানুষের হাতে সহজলভ্য নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের উন্নয়ন-চিন্তার একটি পুরোনো দুর্বলতা সামনে আসে। বাংলাদেশে গবেষণা ও উদ্ভাবনের অভাব নেই; অভাব রয়েছে উদ্ভাবনকে গবেষণাগার থেকে বাজারে নিয়ে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থার।

একজন বিজ্ঞানী বছরের পর বছর গবেষণা করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, কিন্তু সেই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গিয়ে আটকে যায় নানা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও দীর্ঘসূত্রতায়। ফলে সম্ভাবনার জন্ম হয়, কিন্তু তার বাস্তব প্রয়োগ হয় না।

‘সোনালী ব্যাগ’-এর ক্ষেত্রেও যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ এটি শুধু একটি ব্যাগ নয়; এটি একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ, কৃষকের নতুন বাজার সৃষ্টি এবং দেশীয় প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার প্রতীক।

বিশ্ব যখন প্লাস্টিক দূষণ কমাতে মরিয়া, তখন বাংলাদেশ কেন তার নিজস্ব পাটকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবে না?

আমাদের পাট আছে, কৃষক আছে, বিজ্ঞানী আছে, গবেষণা সক্ষমতা আছে। নেই শুধু গবেষণা, শিল্প ও বাজারের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন। এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

তবে ‘সোনালী ব্যাগ’ নিয়ে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি বিকল্প পণ্য বাজারে সফল করতে হলে তার উৎপাদন খরচ, স্থায়িত্ব, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণক্ষমতা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং বাজারমূল্য, সবকিছুই প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।

শুধু পরিবেশবান্ধব হলেই কোনো পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে না। সেটিকে সাশ্রয়ী, টেকসই ও সহজলভ্যও করতে হবে।

এখানেই সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার চাইলে গবেষণাগার থেকে শিল্পকারখানা পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পাইলট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

উৎপাদনকারীদের প্রণোদনা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণে নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে পলিথিনের বিকল্প পণ্যের জন্য বাজারে সমান সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পলিথিনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। মানুষকে বিকল্প দিতে হবে। দোকানদারকে বিকল্প দিতে হবে। ক্রেতাকে বিকল্প দিতে হবে। সেই বিকল্প যদি দেশীয় পাট থেকে তৈরি হয়, তাহলে সেটি আরও বড় সম্ভাবনা।

‘সোনালী ব্যাগ’কে কেন্দ্র করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের উদ্ভাবন-সংস্কৃতি। একজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার যদি বছরের পর বছর পরীক্ষাগারেই পড়ে থাকে, তাহলে তরুণ গবেষকরা ভবিষ্যতে নতুন কিছু উদ্ভাবনে কতটা উৎসাহ পাবেন?

গবেষণার ফল বাস্তব জীবনে প্রয়োগ না হলে গবেষণায় বিনিয়োগের সুফলও সমাজ পায় না। তাই উদ্ভাবনকে শুধু পুরস্কার বা প্রশংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন ও মানুষের ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন পরিবেশ সংকট আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। নদী-খাল ভরাট হচ্ছে, জলাশয়ে প্লাস্টিক জমছে, নগরীতে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, কৃষিজমিতে বর্জ্য জমছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরির প্রতিটি উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

‘সোনালী ব্যাগ’ হয়তো একাই বাংলাদেশের পলিথিন সমস্যার সমাধান করবে না। কিন্তু এটি হতে পারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা। প্রয়োজন আরও গবেষণা, আরও উন্নত প্রযুক্তি, আরও কার্যকর উৎপাদনব্যবস্থা এবং শক্তিশালী বাজারনীতি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।

আমরা চাই না, আরও দশ বছর পরও ‘সোনালী ব্যাগ’ নিয়ে শুধু বক্তৃতা, সেমিনার ও সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ হোক।

আমরা চাই, এটি দেশের বাজারে দেখা যাক; মানুষ যেন সহজে কিনতে পারে; ব্যবসায়ী যেন লাভজনকভাবে বিক্রি করতে পারেন এবং কৃষক যেন এর মাধ্যমে পাটের বাড়তি বাজার পান।

পলিথিনের বিকল্প আমাদের ঘরেই তৈরি হয়েছে, এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু আবিষ্কারকে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে না পারলে সেই গর্ব একসময় হতাশায় পরিণত হবে।

তাই এখনই সময় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটিয়ে ‘সোনালী ব্যাগ’-এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার।

একজন বিজ্ঞানীর স্বপ্ন যেন ফাইলের স্তূপে হারিয়ে না যায়। বাংলাদেশের পাট যেন আবারও বিশ্বকে দেখাতে পারে, পরিবেশ রক্ষার সমাধান শুধু উন্নত বিশ্বের গবেষণাগারে নয়, আমাদের মাটিতেও জন্ম নিতে পারে।

‘সোনালী ব্যাগ’কে সোনার হরিণ না বানিয়ে বাস্তবতার সোনালি সম্ভাবনায় পরিণত করাই এখন সরকারের দায়িত্ব।