স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

ডেস্ক প্রতিবেদক
  ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:১৯ পি এম

ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

বর্ষা এলেই বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ফিরে আসে ডেঙ্গু। প্রতিবছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এখন ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে। একসময় এটি কেবল নগরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এডিস মশার বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ সচেতনতার অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে প্রতিবছর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এডিস মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাসাবাড়ির ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের পানি জমে থাকা স্থান, ছাদের ট্যাংক কিংবা ছোট ছোট পাত্রও মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসব উৎস নিয়মিত ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সম্ভব।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ এলাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নিয়মিত লার্ভা জরিপ, আধুনিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য জনগণের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে অযথা আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই জীবন রক্ষার প্রধান উপায়। জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে র্যাশ, বমি কিংবা পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ সেবন, বিশেষ করে ব্যথানাশক কিছু ওষুধ ব্যবহার, রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার, সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

ডেঙ্গু কোনো মৌসুমি আতঙ্ক নয়; এটি এখন দেশের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং সর্বোপরি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ—এই তিনটির সমন্বয় অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধ। আর সেই প্রতিরোধ শুরু হতে হবে আমাদের নিজের ঘর, আঙিনা ও কর্মস্থল থেকেই। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে।