স্বাস্থ্য সংবাদ ব্রেকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
  ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৩ পি এম

ডায়াবেটিস হওয়ার আগে শরীর যে ১০টি সংকেত দেয়

ছবি: সংগৃহীত

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকজনিত রোগ। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি হঠাৎ করে হয় না। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার আগে শরীর ধীরে ধীরে কিছু সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে। এই পর্যায়কে প্রিডায়াবেটিস (Prediabetes) বলা হয়। এ সময় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, কিন্তু ডায়াবেটিস হিসেবে নির্ণয়ের মতো বেশি নয়। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে এই পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA) এবং আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক মানুষ কোনো লক্ষণই বুঝতে পারেন না। তবে নিচের সংকেতগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি।

১. বারবার তৃষ্ণা লাগা

যদি সারাক্ষণ পানি পান করার ইচ্ছা হয় এবং তৃষ্ণা না মেটে, তাহলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের করতে কিডনি বেশি কাজ করে, ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং তৃষ্ণা বাড়ে।

২. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া

দিনের পাশাপাশি রাতে বারবার প্রস্রাব করতে উঠতে হলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যাওয়ার সময় বেশি পানি টেনে নেয়, ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়।

৩. সব সময় ক্ষুধা লাগা

খাওয়ার পরও যদি দ্রুত ক্ষুধা লাগে, তাহলে এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। শরীর খাবার থেকে যথাযথভাবে শক্তি গ্রহণ করতে না পারলে বারবার ক্ষুধা অনুভূত হয়।

৪. অস্বাভাবিক ক্লান্তি

পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও যদি সারাক্ষণ দুর্বল বা ক্লান্ত লাগে, তবে রক্তের গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তি উৎপাদন করতে না পারার কারণেও এমন হতে পারে।

৫. ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া

কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া অথবা বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমে ওজন বেড়ে যাওয়া—দুটিই ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

৬. ঝাপসা দেখা

রক্তে শর্করার ওঠানামার কারণে চোখের লেন্সে সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে। ফলে ঝাপসা দেখা, চোখে চাপ লাগা বা দৃষ্টিশক্তির সাময়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৭. ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

ছোট কাটা বা আঘাতও যদি দীর্ঘদিনে শুকায়, তাহলে রক্তে অতিরিক্ত শর্করার কারণে রক্তনালির ক্ষতি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

৮. ত্বকে কালচে দাগ

গলা, বগল, কুঁচকি বা ঘাড়ের পেছনে কালচে ও মোটা ধরনের ত্বক দেখা গেলে এটিকে Acanthosis Nigricans বলা হয়। এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের একটি পরিচিত লক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

৯. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব

রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে স্নায়ুর ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি, জ্বালাপোড়া বা অবশভাব অনুভূত হতে পারে।

১০. বারবার সংক্রমণ হওয়া

ত্বক, মাড়ি, মূত্রনালি বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণ যদি ঘন ঘন হয়, তাহলে রক্তে অতিরিক্ত শর্করা জীবাণুর বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

নিচের ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি—

  • বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি।
  • পরিবারের (বিশেষ করে বাবা-মা বা ভাই-বোনের) কারও ডায়াবেটিস আছে।
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা।
  • উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি থাকা।
  • নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস।
  • ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।

কখন পরীক্ষা করবেন?

উপরের একাধিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিচের পরীক্ষাগুলো করা যেতে পারে—

  • ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS)
  • HbA1c
  • ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)
  • র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার (প্রয়োজনে)

কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?

প্রিডায়াবেটিস ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলেই অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

  • প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
  • শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
  • ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন।
  • বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকলে।

শেষ কথা

ডায়াবেটিস হওয়ার আগেই শরীর অনেক সময় নীরবে সতর্কবার্তা দেয়। এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, সময়মতো সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুধু ডায়াবেটিসই নয়, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে।